সম্প্রতি লালমনিরহাট জেলার একটি থানায় পুলিশের ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানে স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতা ফেনসিডিল আমদানির দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। বিষয়টি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। গণমাধ্যমে তার ওই বেফাঁস মন্তব্য যথেষ্ট প্রচার পায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুলিশ সুপারসহ অন্য পুলিশ কর্মকর্তারা বিব্রত হন। প্রশ্ন ওঠে পুলিশের ওপেন হাউস ডে ও এই আয়োজনের উদ্দেশ্য নিয়ে। 

মূলত ওপেন হাউস ডে পুলিশের একটি নিয়মিত কার্যক্রম। ২০০৭ সাল থেকে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় কমিউনিটি পুলিশিং পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তা পালিত হয়ে আসছে। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য কর্মকৌশল হলো থানা বা পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সেবাদানকারী ইউনিটগুলোর ব্যবস্থাপনায় ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠান করা। প্রতি মাসে একবার কোনো নির্দিষ্ট দিনে থানায় খোলামেলা আলোচনার আয়োজন করা হয়। থানা এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেদিন থানায় এসে পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তাদের সুবিধা-অসুবিধা, হয়রানি, তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য তুলে ধরেন। ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানে মেট্রোপলিটন এলাকায় ডেপুটি পুলিশ কমিশনার/অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার/সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং জেলাগুলোতে পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্ত অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পুলিশের সেবা বিষয়ে সরাসরি ধারণা লাভ করেন।

'ওপেন হাউস ডে'র ভাবার্থ হচ্ছে খোলা মন, খোলা মত। মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে পুলিশি সেবা সম্পর্কে খোলাখুলি অভিমত প্রকাশ করার এই সুযোগ পুলিশ ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান দূর করে একটি জনবান্ধব ও গণমুখী পুলিশিং ব্যবস্থা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। 

'পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ' এই স্লোগান ধারণ করে সারাদেশে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমন ও প্রতিকার, অপরাধী বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ অপরাধী গ্রেপ্তার, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদকাসক্তি, অসামাজিক কার্যকলাপ, এলাকাভিত্তিক বিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ হ্রাস ও স্থানীয় সমস্যার সন্তোষজনক সমাধানের ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং পুলিশিং কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। কারণ জনসাধারণের সহায়তা ছাড়া শুধু পুলিশের একার পক্ষে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়।

পুলিশের ওপেন হাউসে ডে তাই কেবল রুটিন কার্যক্রম নয়, অনুষ্ঠানিকতাও নয়। এটি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর অপরাধ, বাল্যবিয়ে রোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে পুলিশের এই মহতী উদ্যোগটি শতভাগ সফল হচ্ছে না। পুলিশের একশ্রেণির কর্মকর্তা এটিকে রুটিন দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন। প্রতি মাসে একটি দায়সারা সভা করে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। কবে, কখন, কোন থানায় ওপেন হাউস ডে হয় অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। আবার কিছু মুখচেনা নিয়ে এমন অনুষ্ঠান করার দৃষ্টান্তও আছে। তাতে থানার আইনশৃঙ্খলার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। মূলত ব্যাপক প্রচার ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ, একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত পুলিশ ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এটি অপরাধ দমনে কার্যকর পন্থা হয়ে উঠতে পারে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পুলিশ বাহিনী পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনবান্ধব, আধুনিক ও দক্ষ একটি পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য প্রতিনিয়ত নির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি থানায় সার্ভিস ডেস্ক, নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কসহ বেশ কিছু গণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে প্রতিটি থানা এলাকায় গৃহহীন পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতিও (পুনাক) অসহায় দুস্থ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। করোনার দুঃসময়ে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে পুলিশ মানবিক ভূমিকা পালন করে অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। 

পুলিশ ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানের সফল আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুলিশ যে জনগণের বন্ধু তা আবারও প্রমাণ করা সম্ভব। ওপেন হাউস ডের আগেই ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, নির্ভয়ে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ সৃষ্টি এবং আভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কার্যক্রম গ্রহণ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোবাইল ও ই-মেইল নম্বর সরবরাহ এবং সম্ভব হলে ফেসবুক লাইভ অথবা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ভার্চুয়ালি মতবিনিয়ম করা যেতে পারে। ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানগুলোকে তাই দায়সারা বা গতানুগতিক নয়, বাদী, অভিযোগকারী ও পুলিশের সেবাপ্রত্যাশী মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যকর করাই হচ্ছে সময়ের দাবি। 

বিষয় : পুলিশ জনগণের বন্ধু ওপেন হাউস ডে পুলিশ জনতা

মন্তব্য করুন