বেশ কিছুদিন ধরে সারাবিশ্বে একটি বিষয় চাউর হয়ে বেড়াচ্ছে। তা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার বর্তমান বিপর্যয়ের ভয়াবহ পরিস্থিতি। কেন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং তা কীভাবে? এর কি কোনো প্রতিকারের উপায় ছিল? এখন শ্রীলঙ্কার করণীয় কী? বিষয়টি শ্রীলঙ্কার বেলায় প্রতীয়মান হলেও বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্ব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি উপমা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমেই আসা যাক, শ্রীলঙ্কার এমন পরিস্থিতির কেন সৃষ্টি হলো? অপরিকল্পিত ও অলাভজনক মেগা প্রকল্প সরকার কর্তৃক গৃহীত। মেগা প্রকল্পের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা। ব্যাপক দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, গণতন্ত্রের নামে রাজতন্ত্রের ছত্রছায়ায় একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কায়েম করা। সরকার কর্তৃক দুর্বল ও ভিত্তিহীন সিদ্ধান্তগুলোর অস্বচ্ছতা, যা জনগণের কাছে উপস্থাপনার স্বচ্ছ জবাবদিহিতার অভাব। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষি খাতকে উপেক্ষা করা। খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন না হয়ে পরনির্ভরশীলতা আশ্রয় নেওয়ার পলিসি গ্রহণ করা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কৃষি ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক সার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। এতে করে খাদ্য উৎপাদন বিপুল পরিমাণে হ্রাস পাওয়ায় বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানির পলিসি গ্রহণ করা। করোনাকালে (দু'বছর ধরে) সঠিক পলিসির অভাবে ট্যুরিজম সেক্টরে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যাপক ধস নামা। কেননা শ্রীলঙ্কা দেশটি প্রধানত রেমিট্যান্স, আইটি এবং ট্যুরিজম সেক্টরের ওপর ভিত্তি করে তাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। একসময় এ দেশটির জিডিপি ছিল মাথাপিছু ৪ হাজার ডলার। দেশটির শিক্ষিতের হার ৯৫ শতাংশ।
আদর্শিক রাজনৈতিক দল না থাকা। গণতন্ত্রের নামে লুটপাট করার প্রবণতা। গণতন্ত্রের নামে প্রশাসন ও আইন বিভাগকে পঙ্গু করে রাখা। পরিবারতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কায়েম। দেশটিতে Norms & Value-এর অবক্ষয়।
এর কি কোনো প্রতিকারের উপায় ছিল? হ্যাঁ ছিল। তা হলো, মুনাফাবিহীন মেগা প্রজেক্টগুলোকে বাতিল করে মুনাফাভিত্তিক মেগা প্রজেক্ট তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের আওতায় আনা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ কাজে লাগিয়ে উৎপাদনমুখী ও লাভজনক প্রজেক্টগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আইটি সেক্টরকে গতিশীল করা। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার নিমিত্তে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রশাসনিক ও আইন বিভাগকে সরকারের অধীন না রেখে পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতার বিভাজন ও স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে জোরালো সম্পর্ক গড়ে তোলা। গার্মেন্ট শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দেশীয় কাঁচামালের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে উৎপাদনমুখী হওয়া এবং তা বৃদ্ধি করে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে এটিকে কেস স্টাডি হিসেবে প্রতিটি রাষ্ট্রের এখন থেকেই কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেসব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটবে, সেসব রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার মতো বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় আমার এই লেখনী। কেননা আমাদের সবার প্রাণের দেশ বাংলাদেশ যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দাঁড়িয়ে থাকা যেন শক্ত পাকাপোক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্য অর্জনে এখন থেকেই পরিকল্পনামাফিক রোডম্যাপ তৈরি করা অতীব জরুরি, যাতে আমাদের সবার প্রাণের প্রিয় এই সোনার বাংলা ভবিষ্যতে শিক্ষণীয় বিষয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সোনার বাংলা হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
ড. মো. সামছুল আলম শামীম : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজ লি.

বিষয় : শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি থেকে শিক্ষণীয় মো. সামছুল আলম শামীম

মন্তব্য করুন