সমকাল :আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ভর্তুকি সুদে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে। কৃষি ব্যাংক এ বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে?

ইসমাইল হোসেন :কৃষি ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়। সবসময় কৃষি ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা বেশি থাকে। অন্যান্য ব্যাংক এ ধরনের ঋণ বিতরণ করতে না পারলে মোট লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কৃষি ব্যাংক বাড়তি ঋণ বিতরণ করে থাকে। চলতি অর্থবছরে আমদানি বিকল্প ফসলে কৃষি ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা বিতরণ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, জুন শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিতরণ হবে।

সমকাল :কৃষকরা অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। এ ধরনের ঋণ বিতরণে কি কোনো অনীহা বা সমস্যা আছে?

ইসমাইল হোসেন :কৃষি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ থাকার কথা নয়। কারণ কৃষি ব্যাংক সবসময়ই বাড়তি ঋণ বিতরণ করে। বরং আমাদের কাছে প্রচুর উদাহরণ আছে যে, আমরা ভালো কৃষকদের ডেকে ঋণ দিচ্ছি। ২০২০-২১ অর্থবছরে সব ব্যাংক মিলে এক কোটি ৭০ লাখ কৃষককে ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ব্যাংক একাই ৮৩ লাখ কৃষককে ঋণ দিয়েছে। সরকার করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, তার মধ্যে সব ব্যাংক মিলে চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে কৃষি ব্যাংক দিয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ফলে কৃষি ব্যাংক প্রকৃত কৃষককে ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে- এমন অভিযোগ কোনোভাবেই ঠিক না। তবে কৃষি ব্যাংকের সমস্যা অন্য জায়গায়।

সমকাল :বিষয়টি পরিস্কার করে বলবেন?

ইসমাইল হোসেন :কৃষি ব্যাংক সরকারের নীতি উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বাজারভিত্তিক সুদে আমানত নিয়ে সর্বোচ্চ আট শতাংশ সুদে বিতরণ করা হয়। অন্যদিকে করোনার কারণে গত দুই বছর সব ধরনের ঋণের সুদহার ছিল চার শতাংশ। যদিও বাকি চার শতাংশ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। সেই ভর্তুকির অর্থও সময়মতো ছাড় হচ্ছে না। কৃষি ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ ছোট। ছোট ঋণে পরিচালন ব্যয় বেশি। এ রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কৃষি ব্যাংককে চলতে হয়।

সমকাল :আমদানি বিকল্প ফসল চাষ বাড়ানোর যে লক্ষ্য তা কী অর্জন হচ্ছে? কৃষকের আগ্রহ কেমন?

ইসমাইল হোসেন :অবশ্যই এর ইতিবাচক প্রভাব আছে। ২০০৬ সালে ডালের দাম বেড়ে যায়। তারপর এই ঋণ কর্মসূচি চালু করে সরকার। এরপর দেশে ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ভুট্টার চাষ অনেক বেড়েছে। পার্বত্য এলাকায় কৃষি ব্যাংকের অনেক গ্রাহক এই ঋণ নিয়ে মসলা চাষ করছেন। আবার পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর অঞ্চলে ডাল, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষে এই ঋণের চাহিদা রয়েছে। ঋণপ্রাপ্ত কৃষকের উৎপাদন এবং লাভ বেশি। আরও দু'একটি খাতে এ ধরনের ঋণ চালু করা যেতে পারে।

সমকাল :আর কোন কোন খাতে এ ধরনের ঋণ চালুর সুযোগ আছে বলে মনে করেন?

ইসমাইল হোসেন :গম ও মালটা চাষে ভর্তুকি সুদে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। দেশে গম উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে। ময়মনসিংহ এলাকায় অনেকে মালটা চাষ করছেন। কিন্তু বাজারভিত্তিক সুদে ঋণ নিয়ে তাঁরা লাভ করতে পারছেন না। ইতোমধ্যে ভর্তুকি সুদের ফসলের তালিকায় গম ও মালটা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি লিখেছে কৃষি ব্যাংক। তবে শুধু ঋণ দিয়ে এসব খাতে উৎপাদন বাড়ানো নিশ্চিত করা যাবে না। আরও কিছু বিষয়ে কাজ করার রয়েছে।

সমকাল :কী ধরনের উদ্যোগ নিলে কৃষক আগ্রহী হবেন?

ইসমাইল হোসেন :দেখুন দেশে কৃষি ও কৃষকের পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন কৃষক আসছেন। নতুন ফসলও চাষ হচ্ছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থায় বিশেষ উন্নতি হয়নি। কৃষকের উৎপাদিত ফসলে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তাও জরুরি। অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠান কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, যা ছোট কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য হুমকিস্বরূপ। এসব বিষয়ে নীতি উদ্যোগ থাকতে হবে। তা না হলে ক্ষুদ্র পর্যায়ে বাণিজ্যিক চাষ উদ্বুদ্ধ হবে না।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ