বার্ষিক আয়ের ওপর যে পরিমাণ কর গুনতে হয়, সেই টাকার অঙ্ক নিয়ে অনেক করদাতাই আতঙ্কে থাকেন। অথচ আমরা অনেকেই জানি না, আইনসম্মত উপায়ে করের বোঝা কিছুটা কমানো সম্ভব। সরকার বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা করের চাপ কমানোর জন্য এই সুযোগ করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে আয়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ বিনিয়োগ করতে হবে। 

সরকারের নির্দিষ্ট কিছু খাত রয়েছে। যেখানে বিনিয়োগ বা দান করলে, বছর শেষে করের পরিমাণ কমে আসবে। কর সমন্বয় করার সবচেয়ে সহজ ও ভালো উপায় হলো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা। ভবিষ্যৎ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা রাখলেও এই সুবিধা পাবেন। আবার শেয়ার কিনলেও মিলবে এমন কর ছাড়। কর রেয়াত নিতে এত দিন বছরে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ ছিল। অর্থ আইন-২০২১ অনুযায়ী তা কমিয়ে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ২৪টি খাত আছে, যেখানে বিনিয়োগ বা দান করলে বছর শেষে সহজেই করের বোঝা কমিয়ে আনা সম্ভব। চলতি কর বর্ষে এই সুবিধা পেতে চাইলে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ বা দান করতে হবে। তাই আপনি চাইলে এখনই প্রস্তুতি নিতে পারেন। 

সুতরাং জেনে নিন কোথায় কোথায় বিনিয়োগ বা দান করলে মিলবে কর ছাড়ের সুবিধা। কর ছাড় পাওয়ার জন্য আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৪৪ (২) ধারাতে প্রায় ২৪টি খাতে বিনিয়োগ বা দানের কথা বলা হয়েছে। এই খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সঞ্চয়পত্র কেনা; সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা; স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তা ও কর্মকর্তার চাঁদা; লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম; কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠী বিমার তহবিলে চাঁদা; সুপার এনুয়েশন ফান্ডে দেওয়া চাঁদা; যে কোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট পেনশন স্কিমে (ডিপিএস) বার্ষিক সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ; শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ; সরকার অনুমোদিত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ; যে কোনো জায়গায় দান করলে কর কমবে- ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ১৩টি খাতে দান করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়। এগুলো হলো- জাতির জনকের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, সরকারি জাকাত তহবিল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অনুমোদিত দাতব্য হাসপাতাল, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক, আহ্‌ছানিয়া ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, এশিয়াটিক সোসাইটি, আইসিসিডিডিআর,বি, সিআরপি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান এবং সরকার অনুমোদিত জনকল্যাণমূলক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আপনি বছরে মোট করযোগ্য আয়ের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ বা দান করতে পারবেন। এর বেশি করলে অতিরিক্ত অংশের কর রেয়াত মিলবে না। আপনার বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার কম হলে মোট বিনিয়োগ ও দানের ১৫ শতাংশ কর ছাড় মিলবে এবং ১৫ লাখ টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ হারে কর ছাড় পাওয়া যাবে।

একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন। দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। এবার একটু হিসাব করা যাক, আপনার করযোগ্য আয়ের প্রথম তিন লাখ টাকার ওপর কর নেই। পরের এক লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ৫ হাজার টাকা; পরের তিন লাখের জন্য ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা এবং পরের ৩ লাখের জন্য ১৫ শতাংশ হারে ৪৫ হাজার টাকা কর হবে। সব মিলিয়ে করের পরিমাণ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু আপনাকে দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা কর।

যেহেতু আপনি দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, যা মোট আয়ের ২৫ শতাংশের মধ্যেই আছে। আর আয়সীমাও ১৫ লাখ টাকার মধ্যে আছে। তাই বিনিয়োগ করা ওই দুই লাখ টাকার ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকা কর রেয়াত পাবেন।

আরও একটি উদাহরণ দিই। ধরা যাক, রহিম সাহেব ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ২০ লাখ টাকা আয় করেছেন। ৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা ডিপিএস জমা করেছেন। এবার একটু হিসাব করা যাক, রহিম সাহেবের করযোগ্য আয়ের প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর কর নেই। পরের ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ৫ হাজার টাকা, পরের ৩ লাখের জন্য ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা, ৪ লাখের জন্য ১৫ শতাংশ হারে ৬০ হাজার টাকা, ৫ লাখের জন্য ২০ শতাংশ হারে ১ লাখ টাকা এবং পরের ৪ লাখের জন্য ২৫ শতাংশ হারে ১ লাখ টাকা কর হবে। সব মিলিয়ে করের পরিমাণ ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। রহিম সাহেব ৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন এবং ৬০ হাজার টাকা ডিপিএস জমা করেছেন। মোট ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। যেহেতু সঞ্চয়পত্র ও ডিপিএস বিনিয়োগের পরিমাণ মোট আয়ের ২৫ শতাংশের মধ্যেই আছে এবং রহিম সাহেবের আয়সীমা ১৫ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে। তাই বিনিয়োগ করা ওই ৪ লাখ ৬০ হাজারের ওপর ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৬ হাজার টাকা কর রেয়াত পাবেন। যেহেতু রহিম সাহেবের করযোগ্য আয়ের ওপর করের পরিমাণ ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। কিন্তু রহিম সাহেবকে ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

তাই আয়করে ভয় নয়, এবং সরকার নির্দেশিত খাতগুলোতে বিনিয়োগ করে স্বাচ্ছন্দ্যে কর আতঙ্ক দূর করুন।