প্রতিকারের আশায় অভিনব প্রতিবাদ করেছেন নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার দুই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থী। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার দুই ইউনিয়নের এই প্রার্থীরা গায়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে এবং হাতে বিষের বোতল নিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী ভবনের সামনে অবস্থান নেন। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। তাঁরা স্থানীয় নির্বাচনী অফিসে লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় নির্বাচনী অফিস ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হন। আমাদের সমাজে নিপীড়ন-নির্যাতন কিংবা বলবানের নানারকম দাপট সইতে না পেরে অনেকেই নীরব প্রতিবাদ জানিয়ে মর্মন্তুদ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেও তাঁদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অন্যায়কারীদের যে থামাতে পারেনি, হাতিয়ার ঘটনাটি এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্ত মাত্র।

যে সমাজে ঘোষণা দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মানুষ, সেই সমাজে সভ্যতা ও মানবতার আলো যে জিইয়ে থাকা অন্ধকার দূর করতে পারেনি, এই সাক্ষ্য বিদ্যমান বাস্তবতার কত বড় নির্মম পরিহাস, তা সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা কতটা অনুভব করেছেন- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। হাতিয়ার দুটি ইউনিয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্বামীর জুলুমের কারণে তাঁরা ভোটের মাঠ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সংসদ সদস্য আয়েসা ফেরদৌসী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। স্ত্রীর ক্ষমতার তাপে উত্তপ্ত হয়ে যে স্বামী এত দাপটের সঙ্গে সমাজ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁর কি আরও কোনো খুঁটি আছে যে কারণে তিনি এতটা বেপরোয়া! স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচনী কর্তারা কি এ জন্য অন্যায়কারীর অন্যায় সয়ে মৌনব্রত পালন করছেন?

হাতিয়ার নবগঠিত ১ নম্বর হরণী ও ২ নম্বর চানন্দি ইউনিয়নে ভোট নেওয়া হবে আগামী ১৫ জুন। নির্বাচন ঘিরে সেখানে প্রার্থীদের হামলা ও প্রচারে বাধা দেওয়ার যে অভিযোগ তাঁরা এনেছেন বিলম্বে হলেও প্রশাসনের তাতে টনক নড়েছে বলে জানা গেছে। ২ জুন জেলার বড় কর্মকর্তারা নাকি সেখানে ছুটে গেছেন। সংসদ সদস্যের স্বামীর 'বিশেষ পছন্দের' প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে তিনি অন্যদের অধিকার খর্বে রণমূর্তি ধারণ করেছেন- এ কথা জানা গেছে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে। প্রশ্ন হচ্ছে- একজন আইনপ্রণেতা, অর্থাৎ সংসদ সদস্যের স্বামী বা স্ত্রী 'ছায়া সংসদ সদস্য' বনে সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার তাপদগ্ধ করার অনেক নজির থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য দৃষ্টান্ত দাঁড় করাতে পারেননি বা পারেন না কেন? এই কেনর সহজ-সরল জবাব সচেতন মানুষ মাত্রই অজানা নয়। 

ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তর। ইতোমধ্যে কয়েক দফায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন। গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নির্বাচন। কিন্তু এই নির্বাচন ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়া নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু নির্বাচন এলেই পরিবেশ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এর নজিরও কম নেই। যারা নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিকার চেয়ে না পেয়ে কেন্দ্রে এলেন সেখানেও তাঁরা ভুগলেন অন্যরকম নিরাপত্তাহীনতায়! পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা নাকি তাঁদের হুমকি-ধমকি দিয়েই শুধু ক্ষান্ত হননি, গ্রেপ্তারের ভয়ও দেখিয়েছেন। এমতাবস্থায় বিপদাপন্ন মানুষ কোথায় যাবে?

৩১ মে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এক নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, পেশিশক্তি ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না। স্বস্তির কথা। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে এমন 'অমিয় বাণী' আমরা অতীতে অনেক শুনেছি এবং সমান্তরালে বৈরী চিত্রও কম দেখা যায়নি। কাফনের কাপড় ও বিষের বোতল নিয়ে যাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন, তাঁদের দাবি আমলে নিয়ে প্রতিকার না করলে তাঁরা আত্মহত্যা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাতে বুঝতে কোনোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, তাঁরা কতটা জীবন শঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে জীবন রক্ষার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কেন তাঁদের এতটা পথ পাড়ি দিতে হলো? কেন স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি? কেন এত বিলম্বে জেলার বড় কর্তারা ঘটনাস্থলে গেলেন? এর মধ্যে যদি কোনো অঘটন ঘটে যেত এর দায়ভার নিতেন কে বা কারা?

ক্ষমতাবান কিংবা বলবানদের দাপটে এই সমাজ কতটা থরথর এর বহু নজির আমাদের সামনে আছে। শুধু সামাজিক পর্যায়েই নয়, রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক ক্ষমতাবান আছেন যাঁদের অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরূপ মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। প্রশ্ন হচ্ছে- তাঁরা কি সবকিছুর ঊর্ধ্বে কিংবা স্পর্শের বাইরেই থেকে যাবেন?