কানাডার প্রবাস জীবনে আজ বাবাকে নিয়ে অনেক কথাই আজ মনে পড়ছে। যদিও আজকের উপলক্ষ আনন্দের। বাবার প্রাপ্তি আমার প্রেরণা। মাঝেমধ্যে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের সেই দুটি লাইন--'যেদিন অযোধ্যার লোকেরা সীতাকে বিসর্জন দিতে গিয়েছিল, সেদিন সেই দলে যে আমিও ছিলাম'। জানি না সন্তান হিসেবে কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। তবে এ কথা পরম সত্য, প্রতিনিয়ত বাবার কাছ থেকে শিখছি।

একজন মফস্বল সাংবাদিকের সন্তান হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। গর্ববোধ করছি এই ভেবে, অর্থই জীবনের সব হতে পারে না, এর প্রমাণ আমার বাবা। ছোটবেলা থেকেই শিখেছি অর্থ উপার্জনের চেয়ে কীভাবে সম্মান অর্জন করতে হয়। কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। কীভাবে অন্যকে মর্যাদা দিতে হয়। পরম শত্রু জেনেও তার সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। আজ অবধি শিখছি। 

মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, ধৈর্যশীল এই মানুষটি রাজবাড়ী জেলা তথা বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের প্রথিতযশা এবং প্রবীণ সাংবাদিক। ছাত্রজীবন থেকে যাঁর সাংবাদিকতা শুরু এবং তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যিনি আপাদমস্তক একজন সফল মফস্বল সাংবাদিক।

আজ ১৭ বছর প্রবাস জীবন অতিবাহিত হলেও একটি দিনের জন্যও তাকে ফোন করা থেকে বিরত হইনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মাকে হারিয়েছি। এর দু'দিন আগে মায়ের অসুস্থতা দেখে আব্বা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড। জীবনের এক চরম সত্যির মাঝখানে তাঁর পদার্পণ। এ যাত্রায় আমরা কেউ তাঁর সঙ্গী নই। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুধুই হিসাব মেলানোর চেষ্টা। কখনও মেলে আবার কখনও সরল অঙ্কের সান্ত্বনা শূন্য।

এমবিএ ফাইনাল পরীক্ষার প্রারম্ভে বাবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাংবাদিকতা বিএনপি-জামায়াত সরকার কোনো কারণ ছাড়াই কেড়ে নিল। পরিবারের, বাবার ও আমার পড়ালেখার বৃত্তান্ত বর্ণনা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করলাম বাবার চাকরিটা ফেরত দেওয়া হোক। অর্থ নয়, সম্মানের দিক চিন্তা করে হলেও চাকরিটা ফেরত দিন। বিধিবাম। কোনো কথাই শুনলেন না।

অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে আমার বাবা গুণী সাংবাদিক হিসেবে 'মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২১' পেলেন বসুন্ধরা গ্রুপের কাছ থেকে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীতের সময় আবেগাপল্গুত হয়ে অঝোর ধারায় কাঁদলেন আমার বাবা। জীবন সায়েহ্নে এই সম্মাননা বাবাকে মনে করিয়ে দেয় সারাজীবনের প্রাপ্তি আর হিসাব-নিকাশের সমাপ্তি।

কানাডার প্রবাস জীবনে বাবার এই সম্মাননা প্রাপ্তি আমার সবকিছুকেই ভুলিয়ে দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে আমি ব্যাংকার হলেও অনেকেই জানেন আমি আপাদমস্তক সাংবাদিক। কিন্তু আমি এখনও শিখছি। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে অনুসরণ করি। তাঁর সাংবাদিকতা, লেখার ধরন ও সাংবাদিকতার প্রতি একাগ্রতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিনিয়ত বাবার কাছ থেকে শিখছি।

পরিশেষে বাবাকে সম্মাননা দেওয়ায় সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে ফিরে যাচ্ছি শৈশবের সেই মফস্বল সাংবাদিক আমার বাবার সোনালি দিনগুলোতে, যেখানে আমার মা রান্না করে বসে আছেন, কখন বাবা আসবে গরম ভাত খেতে। 'সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।'

বিষয় : মফস্বল সাংবাদিক প্রবীণ সাংবাদিক

মন্তব্য করুন