মানবজাতিকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জন্য সবুজ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা এবং জীবজগৎ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭তম অধিবেশনে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশকে সুস্থ রাখার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর এই দিনে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'একটাই পৃথিবী : প্রকৃতির ঐকতানে টেকসই জীবন'। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই জীবনযাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই প্রতিপাদ্যর মাধ্যমে।

পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাংলাদেশ 

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতির অংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি, কনভেনশন, প্রটোকল ইত্যাদিতে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮ বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পরিবেশ দূষণ রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা ও সুশাসন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেপ (ইপিআই)-২০২২ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম, যাতে পরিবেশ দূষণ রোধে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থান চতুর্থ। আইকিউএয়ার-ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০১০ অনুযায়ী, বায়ুদূষণের বিভিন্ন উপাদানের বার্ষিক গড় উপস্থিতির হিসেবে দূষণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে এবং দূষিত রাজধানীর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। জাতিসংঘ পরিবেশ সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতি বছর মানুষের মোট মৃত্যুর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ (১২.৬ মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশগত বিপর্যয়জনিত কারণে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট (এইচইআই) পরিচালিত 'দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০২০' গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণজনিত কারণে গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩১,৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭' অনুযায়ী বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণজনিত কারণে প্রতি বছর জিডিপির ২.৭ শতাংশ হারায়; পোশাক উৎপাদনকারী কারখানাগুলো থেকে প্রতি এক টন কাপড় উৎপাদনের বিপরীতে ২০০ টন বর্জ্য পানি নির্গত হয় এবং বিবিধ প্রকার দূষণের কারণে ২০১৭ সালের বর্ষা মৌসুমে রাজধানীতে টিকে থাকা ১৩টি খালের মধ্যে সচল ছিল মাত্র দুটি। অন্যদিকে, 'বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৮' অনুযায়ী বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের কারণে মৃত্যুর হার ২৭.৭%; বায়ুদূষণের ফলে প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা; মূলত পাঁচটি উৎস থেকে বায়ুদূষণ হয়, যেমন- ইটভাটা (৫৮%), যানবাহনের ধোঁয়া (১০%), মাটি ও সড়কের ধুলা (৮%) এবং কাঠসহ নানা ধরনের বস্তু পোড়ানো (৭%)।

বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের ২০২১ সালে প্রকাশিত 'গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেপ' (সিআরআই) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা-সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (অভীষ্ট ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫) অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব। পরিবেশ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশন, প্রটোকল ও চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবেও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব রয়েছে। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন আইন থাকলেও পানি, বায়ু, শব্দদূষণসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্জ্য শোধনাগার ছাড়াই পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করা, ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক যোগসাজশ, বিভিন্ন পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (রামপাল, রূপপুর) প্রতিবেদন তৈরির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বিতর্ক ইত্যাদি। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর বিভিন্ন ধারার দুর্বলতার সুযোগে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় বৃহৎ ও ভারী শিল্প প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ শর্তহীনভাবে ৫% এবং তহবিল প্রাপ্তিসাপেক্ষে ১৫% কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও তা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বরং সুপার ক্রিটিক্যাল ও আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির নামে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে এবং প্রস্তাবিত ১৮টি প্রকল্প থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর ১ লাখ ১০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণের আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

পরিবেশ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও আইন প্রতিপালনে ঘাটতি 

বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলাদেশের পরিবেশের স্বার্থ রক্ষার্থে পরিবেশ অধিদপ্তর বেশকিছু আইন, বিধি ও নীতিমালা অনুযায়ী এর ওপর ন্যস্ত আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশ-সংক্রান্ত আইন ও বিধির কিছু সীমবাদ্ধতা, প্রতিপালনে ঘাটতি, প্রায়োগিক চ্যালেঞ্জ ও তার প্রভাবের কারণে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় একদিকে যেমন পরিবেশ-সংক্রান্ত আইনের কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে এবং অন্যদিকে বিদ্যমান আইন, বিধিমালাসহ সম্পূরক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যর্থতার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর ৫ নম্বর ধারায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সীমানা নির্ধারণ করার এখতিয়ার না থাকায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সন্নিকটে ভারী শিল্প কারখানাসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। ধারা ৬(ক)-তে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ও লেমিনেটেড প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে না পারার কারণে প্লাস্টিক দূষণ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশ আদালত আইন ২০১০-এর অধীনে প্রত্যেক জেলায় এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান [ধারা ৪(১)] থাকলেও বর্তমানে সারাদেশে মাত্র তিনটি পরিবেশ আদালত ও একটি পরিবেশ আপিল আদালত রয়েছে। এর ফলে পরিবেশ দূষণ-সংক্রান্ত মামলার বিচারে বিলম্বের পাশাপাশি মামলা পরিচালনায় বাদী-বিবাদীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করার অনুমতি নিতে হয় [ধারা ৬(১)]। মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারলেও সাধারণ মানুষ মামলা করতে পারে না, অর্থ্যাৎ একজন ভুক্তভোগী এখানে সরাসরি মামলা করতে পারেন না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে অনুমোদনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগকারীকে আবেদন করতে হয়। কর্তৃপক্ষ অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে ৬০ দিনের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী মামলা করার অনুমোদন দেয়। আইনের এসব শর্ত পূরণ করে কোনো বিচারপ্রার্থী এখানে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ধারা ৫-এ ইট তৈরিতে নিষিদ্ধ মাটির উৎস হিসেবে 'কৃষিজমি' বলতে দুই বা তার বেশি ফসলি জমির উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এক ফসলি উর্বর কৃষিজমির মাটি কেটে ইট তৈরি অব্যাহত রয়েছে। এই আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় কৃষি ও উর্বর জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ইট তৈরি অব্যাহত থাকায় মাটি উর্বরতা শক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে। এ ছাড়া ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও [ধারা ৬] কাঠের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। ধারা ৩(ক)-তে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও ফসলি জমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও ইটভাটাগুলো গড়ে উঠছে ফসলি জমি দখল করে লোকালয়ের পাশ ঘেঁষে। ২০১৯ সালে আইনটি সংশোধিত করে ধারা ৫(৩ক) যোগ করা হয় এবং পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন জারি করে মাটির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে হ্রাসকল্পে সব সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে শুধু সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন নির্মাণকাজে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক না হওয়ায় বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন নির্মাণ কাজে ব্লক ইটের ব্যবহার ও প্রসারে ঘাটতি রয়েছে এবং কৃষি ও উর্বর জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ইট তৈরি অব্যাহত রয়েছে। ফলে মাটির ব্যবহার হ্রাসে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭-এর বিধি ১৩ অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প ও শিল্পকারখানাগুলো কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় বর্জ্য পরিবেশে উন্মুক্ত না করার নির্দেশনা থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন প্রকল্প ও শিল্পকারখানা থেকে নির্ধারিত মাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় বর্জ্য নিঃসরণ হচ্ছে। বিধি ৭(২) অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপন না করার নির্দেশনা থাকলেও পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ফলে শব্দ, পানি ও বায়ুদূষণসহ সরকারি সম্পত্তির (পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস) অপব্যবহার এবং যে কোনো মুহূর্তে ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ডসহ রয়েছে নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য সব শ্রেণির শিল্পকারখানার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া আবশ্যক [বিধি ৭(৬)] হলেও এটি ছাড়াই পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র প্রদান করা হচ্ছে। ফলে সুযোগ পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ স্থানে শিল্পকারখানা স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। 

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয়

প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই জীবনযাপন করায় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিতে এখনই সময় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। প্রথমত, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তরসহ পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম তদারকি ও পরিবীক্ষণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও এর কার্যকর ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, 'বাংলাদেশ পরিবেশ আইন, ১৯৯৫' এর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী বড় উন্নয়ন প্রকল্প এবং শিল্পকারখানাগুলোকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। তৃতীয়ত, 'জাতীয় পরিবেশ নীতি, ২০১৮' যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ আদায়ে ক্ষতিকারক কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রয়োগ করে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ (দূষণ কর) আদায় করতে হবে। চতুর্থত, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিতে পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষেত্রে সম্পদের ব্যবহার হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও পুনর্চক্রায়ন নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় স্বপ্রণোদিত ও উদ্যমী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে এবং শিক্ষা কারিকুলামগুলোতে এনভায়রনমেন্টাল এথিকস, পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ষষ্ঠত, ত্রুটিমুক্ত পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন নিশ্চিত করতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং পরিবেশ ছাড়পত্রকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধসহ ইটিপির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, আমাদের একটাই পৃথিবীকে রক্ষায় এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই জীবনযাপন নিশ্চিতে পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিতে সরকারকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে এবং সংশ্নিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।