ব্যবসায়িক নগরী চট্টগ্রামের অদূরে সীতাকুণ্ডে বেসরকারি কনটেইনারটি ডিপোতে রাসায়নিকের স্মরণাতীত বিস্টেম্ফারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ৪৯ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। কয়েকশ মানুষ আহত অবস্থায় জীবনের সঙ্গে লড়ছে। মানুষের আহাজারি আকাশ-বাতাস ভারী করেছে। মানবতার অনুভূতি নিয়ে সব শ্রেণির মানুষ সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ৩৬ ঘণ্টা পরও আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। দেশের ফায়ার ব্রিগেডের ৩৫টি ইউনিট কাজ করে যাচ্ছে। নৌবাহিনী, সেনাবাহিনীও নিযুক্ত আছে। জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনগণের সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

রাসায়নিকের মজুত কখনোই বিপদমুক্ত নয়। রাসায়নিক-সম্পৃক্ত ডিপোগুলোতে যে ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়, নেওয়া হয়, নেওয়া দরকার- তা এখানে অনুপস্থিত ছিল বলে দৃশ্যমান হয়। এখানে মজুত ছিল সংবেদনশীল বিস্টেম্ফারক তরল হাইড্রোজেন-পার-অপাইড। এটি আলো-তাপ-চাপ ও উষ্ণতা সংবেদনশীল একটি তরল। এর বিপদ বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করে। ওষুধ কিংবা প্রসাধনী শিল্পে এই তরলের ব্যবহার আছে। ব্যবহার আছে গার্মেন্টস শিল্পে। জানা গেছে, এখানে প্রায় ২৫টি কনটেইনারে এই রাসায়নিকের মজুত ছিল। টিনের শেড, পাশাপাশি অবস্থান, সূর্যের আলোর সম্পৃক্ততা, তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণহীনতা এই তরলের বিক্ষুব্ধতাকে উসকে দিতে পারে। এর সঙ্গে ফায়ার ব্রিগেডের পানি কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এর রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই বিপজ্জনক তরলটির সংরক্ষণে বিধিবিধান অনুসৃত হয়নি। সংশ্নিষ্টরা এতটুকু সচেতন ছিল না। মৃত্যুর বিভীষিকা, কনটেইনারের বিস্টেম্ফারণ, একটির পর একটি কনটেইনারের আগুন ছড়িয়ে যাওয়া, প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া কর্তৃপক্ষ উদাসীনতা এড়াতে পারে না। আমাদের বিধি আছে, বোধ-বিবেক কিংবা তদারকি নেই। আইন প্রয়োগে তদারকির অভাব ও নির্লিপ্ততা আমাদের বিপর্যয় ও বিপদ সংঘটনের অন্যতম পথ।

হাইড্রোজেন-পার-অপাইড সংরক্ষণে, ব্যবহার ও বাণিজ্যে কতগুলো নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তাপমাত্রা, চাপ, সূর্যের আলো এবং এক কনটেইনার থেকে অন্য কনটেইনারের নিরাপদ দূরত্ব। এটি তরল কঠিন সব রাসায়নিকের ক্ষেত্রেই অনুসরণযোগ্য একটি প্রথা। আমরা অনুসরণ করি না। বিস্টেম্ফারণ ও অগ্নিকাণ্ডের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, সংঘটন স্থলে এসবের ঘাটতি ছিল। অন্য কোনো রাসায়নিকের উপস্থিতি কিংবা উপস্থিতি ছিল কিনা, তাও খুঁজে দেখা দরকার। একটি রাসায়নিক ডিপোতে বহুমাত্রিক রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে। এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকলে বিপদ আসতেই পারে। বিপদ সম্পর্কে সংশ্নিষ্টরা সচেতন ছিলেন মনে হয় না।

এমনকি ঘটনা ঘটার পর মনে হয়েছে, আমাদের আগুন নিয়ন্ত্রণ যোদ্ধাদের রাসায়নিকের বিপর্যয়, বিপদ কিংবা সংশ্নিষ্টতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব ছিল। এতগুলো যোদ্ধার মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে কষ্ট দেয়। সব আগুন পানি দিয়ে নিবৃত্ত করা যায় না। এখানে পানি ব্যবহার করে কার্যত বিস্টেম্ফারণকে উসকে দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল অজ্ঞতা। ডিপো কর্তৃপক্ষ উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে এ রকম বিপর্যয়কে আরও বড় করেছেন।

সরকারি একাধিক কর্তৃপক্ষ সংবেদনশীল এসব ডিপোর নিয়মিত তদারকিতে অবহেলার পরিচয় দিয়েছে। ঘনজনবসতি এলাকায় এমন একটি ডিপোর অবস্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পুরান ঢাকার ঘনবসবাস এলাকায় এরকম বিপজ্জনক রাসায়নিকের বিপর্যয় অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি। ২০২০ সালের বৈরুতের রাসায়নিক বিপর্যয় এবং কয়েকশ' মানুষের প্রাণহানি আমাদের অতীতের শিক্ষার অংশ। রাসায়নিকের সঙ্গে বসবাসের কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের যে অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তার চরম ঘাটতি এখানে বিরাজ করেছে।

ব্যবসা আমাদের করতে হবে, কিন্তু অজ্ঞতা দিয়ে নয়। আমাদের ব্যবসার সঙ্গে অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা, জনসম্পৃক্ততা এবং জননিরাপত্তাকে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখতে হবে। এসব বিষয়গুলো নিয়ে আগামী দিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সামাজিক ও পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্রিয়া-কলাপে আরও অধিক যত্নবান হতে হবে সংশ্নিষ্টদের।

সার্বিক সচেতনতার ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত করতে হবে। রাসায়নিকের ব্যবসা কিংবা মজুতে কিংবা স্থানান্তরে রাসায়ন সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্ট মানুষদের যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি কনটেইনার ডিপোতে সংরক্ষণাগার কী পরিমাণ, কোন চরিত্রের রাসায়নিক সংরক্ষিত আছে, কতদিন ধরে আছে, তার প্রক্রিয়া কী, গন্তব্য কী, কতটুকু, কীভাবে, কোন কাজে, কত সময়ে ব্যবহার হচ্ছে- সে বিষয়ে পরিস্কার চিত্র বিধি মোতাবেক বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হবে।

এর তদারকি করতে হবে। এই রাসায়নিকগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের যত্নবান হতে হবে। কোনোভাবেই লোকালয়-সম্পৃক্ত সংরক্ষণাগার বা ডিপো স্থাপন কিংবা বিস্তৃত করা যাবে না। এখানে যে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকতার বিপর্যয় ঘটেছে, তা বহুদিন পর্যন্ত বিরাজ করবে। বাতাস দূষিত হয়েছে। মাটি দূষিত হয়েছে, সবুজ বিপন্ন হয়েছে এবং খাল-নালার সঙ্গে সম্পৃক্ত সাগর দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে।

ব্যবসা আমাদের করতে হবে। ব্যবসার আন্তর্জাতিকীকরণ, সতর্কতা অবলম্বন এবং জীবন মানের সম্পৃক্ততাকে আধুনিকায়ন করতে হবে। বিভিন্ন বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর জন্য হাসপাতালে সক্ষমতা ও সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতের শিল্প কর্মকাণ্ডের বাংলাদেশ শিল্পের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট-সম্পৃক্ত মানুষগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। সার্বিক সচেতনতায় আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির টেকসই বিস্তৃত পথ রচনা করতে হবে। সেদিকে সংশ্নিষ্টদের মনোযোগী হতে হবে।

আমরা গভীরভাবে শোকাহত- সীতাকুণ্ডের অনাকাঙ্ক্ষিত এ দুর্ঘটনায় যারা জীবন দিয়েছে, যারা অকালে মৃত্যুবরণ করেছে, আমরা সমবেদনা জানাচ্ছি, যারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব ধরনের বিপর্যয় কাটিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক পথে আমাদের শিল্পকর্ম এগিয়ে যাক- এ প্রত্যাশা করি।

বিষয় : ডিপোতে রাসায়নিক মৃত্যুর বিভীষিকা কনটেইনারের বিস্টেম্ফারণ

মন্তব্য করুন