আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকরা যেমন, তেমনি রাজনীতিকরাও অহরহ গণতন্ত্রের নানা সবক দিয়ে থাকেন। এসব 'অমিয় বাণী' তাঁদের অনুসারীরা কতটা ধারণ করেন- এ নিয়ে প্রশ্ন আছে বিস্তর। ক্ষণে ক্ষণে সৃষ্টি হয় প্রশ্নের। ৭ জুন বিকেলে চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি ঘটনা ফের এমন প্রশ্নেরই উদ্রেক ঘটিয়েছে। ৮ জুন সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিতে দগ্ধ ও আহত রোগীদের দেখতে গিয়ে ফেরার পথে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিসহ সমমনা কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর ঘটেছে হামলার ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগের কতিপয় কর্মী তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এতে জোনায়েদ সাকিসহ তাঁদের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন এবং চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে সর্বাগ্রে পরমতসহিষ্ণুতা ও ভিন্ন মতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে কেন বারবার এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।

এ হামলার ব্যাপারে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার মোখলেচুর রহমান সমকালকে জানিয়েছেন, ঘটনাটি তাঁরা শুনেছেন। কারা ঘটিয়েছে এই ঘটনা, তা তাঁরা জানার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁরা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। দায়িত্বশীলদের এমন গতানুগতিক ভাষ্য নতুন কিছু নয়। একই সঙ্গে এও পুরোনো, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেন না এবং আইনগত ব্যবস্থা নেন না! জোনায়েদ সাকিসহ তাঁর সমমনাদের ওপর হামলার ঘটনাটি যে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যজাত, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ক্ষীণ। প্রশ্ন হচ্ছে- দায়বদ্ধতা কিংবা দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে কি ভিন্ন মতাবলম্বীদের সীতাকুণ্ডের মতো যে কোনো মর্মন্তুদ ঘটনায় আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো গর্হিত কিছু। তা ছাড়া বিরোধীদের কি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার নেই? একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত-নিন্দনীয় তো বটেই, একই সঙ্গে চরম গর্হিতও। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত এক পদবাচ্য হচ্ছে 'গায়েবি মামলা'। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হয় না এবং নিরপরাধ কাউকে জড়িয়ে, হেনস্তা করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চলে। এ জন্যই অপ্রীতিকর ঘটনার রাশ টানা যায় না।

প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই আমরা দেখেছি, বিরোধী মত-পথের রাজনীতিকদের দমন-পীড়নে কখনও প্রত্যক্ষভাবে প্রশাসনযন্ত্র, আবার কখনও তাদের ছাত্র-যুবা অনুসারীদের নানা কৌশলে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এটা সত্য, ভয় দেখিয়ে কোনো কিছু জয় করা যায় না। মনে পড়ছে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি- 'আমি তোমার কথার সঙ্গে বিন্দুমাত্র একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দেব।' আমাদের দেশের অনেকেই, বিশেষ করে রাজনীতিকরা সেটি উদ্ৃব্দতও করেন। অনেকেই শুধু সহমত সহ্য করতেই যেন অভ্যস্ত, ভিন্নমত নয়। বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা ভিন্নমতের পরিস্থিতি নিয়ে অনেক মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। নানা আন্তর্জাতিক সূচকে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি সূচকে আমাদের অবস্থান নিচের দিকেই থাকে। আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, অনেকেই সংবিধান মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজেরাই একটা মাপকাঠি ঠিক করে নিয়েছেন। এই স্বেচ্ছানির্ধারিত মাপকাঠিই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অদৃশ্য এক ধরনের ভীতি তাড়া করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, মানুষের মৌলিক অধিকার কোনটির কতটুকু সীমা, সেটা সংবিধানে লেখা আছে।

একটি রাষ্ট্রের কিছু লক্ষণ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশটি কতটুকু গণতান্ত্রিক। রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ, রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের কতটা অনুশীলন করে? কিন্তু পরিশীলিত হওয়ার জন্য তা কতটা অপরিহার্য, এও সচেতন মানুষমাত্রই জানা। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর ছিল বিভিন্ন দেশে- এ অভিমত অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর। তাঁদের এও অভিমত, এখন বিশ্বের অনেক দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- আমরাও কি সেই কাতারভুক্ত। জোনায়েদ সাকিদের ওপর হামলার ঘটনাটি কি এরই একটা প্রতিফলন? অনেকেই হয়তো চার্লি চ্যাপলিন অভিনীত বিদ্রুপাত্মক চলচ্চিত্র 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর' ছবিটি দেখেছেন, যেখানে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরূপ চিত্র চিত্রিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি যেন এখনও সময়ের কথা বলছে। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে যদি ভিন্নমত কিংবা কর্মকাণ্ড হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে বিপদাশঙ্কা প্রকট হয়ে ওঠে।

'গড্ডলিকাপ্রবাহ' শব্দটি সুপরিচিত। এর অর্থটা কিন্তু ততটা পরিচিত নয়। 'গড্ডলিকা' মানে ভেড়ি। ভেড়ার দলে এই ভেড়ি সবার সামনে থাকে। অভিধানে 'গড্ডলিকাপ্রবাহ' শব্দটির অর্থ করা হয়েছে- 'পালের ভেড়ারা যেমন অন্ধের মতো অগ্রবর্তী ভেড়া বা ভেড়িকে অনুসরণ করে, তেমনি ভালো-মন্দ বিচার না করে অন্য সবার সঙ্গে অগ্রবর্তীকে অনুসরণ করে।' দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের রাজনীতির অনেক ক্ষেত্রে এই 'গড্ডলিকাপ্রবাহ' শব্দটি জেঁকে বসেছে। প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান বিদ্রুপ করে লিখেছিলেন, 'মেষরে মেষ, তুই আছিস বেশ।' কিন্তু মানুষ তো শুধু প্রাণী মাত্র নয়; মানুষ সামাজিক জীব। তার হিতাহিত জ্ঞান থাকবে, এটিই তো প্রত্যাশিত। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে মনীষী অ্যারিস্টেটল বলেছিলেন, 'মানুষ রাজনৈতিক জীব। সে রাজনীতি না করে পারে না। এক পথে তার রাজনীতি করা বন্ধ হলে অন্য পথ ধরবে।' কিন্তু আমাদের সমাজে রাজনীতির নামে কখনও কখনও যে কদাচার খুব বেশি দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে, তা খুব অসহনীয়ও মনে হয়। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে? আমরা দেখেছি, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হামলে পড়ার বিষদৃশ্য।

আমরা আরও দেখেছি, ভিন্নমত পোষণ করার দায়ে অভিজিৎ রায়সহ অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। ক্ষমতাবানদের হাত ধরে পীড়নের যে অপসংস্কৃতি সমাজকে গ্রাস করছে, এ থেকে মুক্তির পথ সরকারকেই বাতলাতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। নিজেদের জন্য তো বটেই, একই সঙ্গে জনসমাজের বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনেও। জোনায়েদ সাকিরা কাদের দ্বারা আক্রান্ত হলেন, তা চিহ্নিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও প্রশাসন প্রমাণ করুক- 'অপরাধী যে-ই হোক, ক্ষমা নেই'; এ শুধু কথার কথা নয়। আইনের চোখে সবাই সমান- এর প্রতিফলন যদি প্রকৃতার্থে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে সামাজিক-রাজনৈতিক সাম্য কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।