পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য। আমাদের সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে পানিকে ঘিরে, যা জীবনের অস্তিত্বের জন্য পানির অপরিহার্যতাকেই নির্দেশ করে। এ ছাড়া বৈজ্ঞানিকভাবেও সত্য যে, পানি ছাড়া জীবন অসম্ভব। আমাদের জীবনাচার, সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনি এবং প্রতিদিন যাপিত জীবনে অনুসরণ করা ধর্মীয় রীতি-নীতিতে পানিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং এর বিশুদ্ধতা রক্ষণের বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্কৃতিও পানির অমূল্য তাৎপর্যকে নিজস্ব পদ্ধতিতে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে পানিকে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যক্ত করা হয়েছে। এর মতে, পানি জীবনের একটি অংশ, সেখান থেকেই আমাদের সৃষ্টি, যাকে কেন্দ্র করে আমরা বাঁচি, প্রশ্বাস নিই এবং আমরা বেঁচে থাকার জন্য গ্রহণ করি। পবিত্র কোরআনে সুরা নামল (আয়াত ৬১) উল্লেখ আছে, 'আর যিনি জমিনকে করেছেন স্থির এবং তার মাঝে সৃষ্টি করেছেন নদ-নদী' (সুরা ইবরাহিম :৩২)। এসব নদ-নদীকে মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন করা এবং এর ব্যবহার নিয়ে কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যেমন, 'আর তিনি নদীগুলোকে তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন' (সুরা ইবরাহিম :৩২) এবং এর সঙ্গে অন্য আরেক সুরায় বলা হয়েছে, 'তোমরা পানাহার কর; তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না' (সুরা আরাফ :৩১)। এখানে দেখা যাচ্ছে ইসলাম ধর্মে পানির গুরুত্ব যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি সম্পদের অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে চরমভাবে। সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন, 'আর আমি সব প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?' ইসলাম ধর্মের যারা অনুসারী তাঁরা নিশ্চয়ই পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং এর অপচয় না করার শিক্ষা পেয়েছে এবং সে শিক্ষাকে যদি নিজ জীবনাচারে প্রয়োগ করে তবে পানির পবিত্রতা রক্ষা করা এবং অপচয় বন্ধ করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব।

ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের লালিত আচার মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পানি অতি পবিত্র, কারণ তাদের বিশ্বাস পানির রয়েছে বিশুদ্ধকরণ এবং পরিষ্কারকরণ ক্ষমতা। এ ছাড়া এ ধর্ম মতে, শারীরিক ও আত্মিক কল্যাণ সম্ভব পরিশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে এবং এই পরিশুদ্ধির জন্য পানির প্রয়োজন। হিন্দু ধর্ম মতে, ধ্যান এবং আচারের জন্য অতি আবশ্যক পাঁচটি উপাদানের মধ্যে পানি অন্যতম। ব্রহ্মা হতে সৃষ্ট পৃথিবী পানি হতে উত্থিত হয়েছিল বলেও তাদের বিশ্বাস। রিগ-বেদের বর্ণনা মতে, শুরুতে সবকিছুই সমুদ্রের মতো এবং আলোহীন ছিল। হিন্দু ধর্ম অনুসারীরা হিমালয় থেকে উৎপত্তি লাভ করা গঙ্গা নদীকে পবিত্র মনে করে। বলা হয় গঙ্গায় স্নান বিশ্বাসীদের পবিত্রতা এবং পাপ থেকে মুক্তি দান করতে পারে। আর যে পানি পবিত্রতা দান করে বলে বিশ্বাস করা হয় সেই পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা করা তো একান্ত কর্তব্য।

জুডো খ্রিষ্টান বিশ্বাস মতে, ঈশ্বরের আত্মা কিংবা শ্বাস পানির ওপর পরিচালিত হওয়ায় (জেনেসিস ১ :২) সেখান থেকে গতি লাভ করে পরবর্তী ছয় দিনে পবিত্র জীবনের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, খ্রিষ্ট ধর্মে পানি ব্যাপ্টিজমের আচারের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে একজন অনুগামী 'পবিত্র পানিতে' স্নানের মাধ্যমে তার বিশ্বাসকে পোক্ত করে। এটিকে পুনর্জন্ম এবং বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবেও চিন্তা করা হয়। বিশুদ্ধতা দানকারী এমন একটি অনুষঙ্গকে পবিত্রভাবে সংরক্ষণ ধর্মে বিশ্বাসীমাত্র অবশ্য কর্তব্য।

একজন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী তাঁকে আলোকিত করার পথে দেহ, মন এবং আত্মার পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ ধর্ম পালনকারীরা পানির প্রশান্তি এবং নির্মলতাকে জীবনাচারে অনুশীলন করে এবং তার প্রকাশ হিসেবে মন্দিরগুলোতে অনুগামীদের পবিত্র পানি দান করার প্রথা রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বন, নদী এবং পাহাড়ের মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে আধ্যাত্মিক রূপান্তর (নির্বাণ) খুঁজছেন এবং সমগ্র বিশ্বজগৎকে- মানুষ, প্রাণী, পানি, পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ এবং নক্ষত্রকে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখেন। প্রকৃতির ওপর এমন নির্ভরশীলতা যেখানে-সেখানে মাটি, পানি, বাতাসের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে জীবের উদ্ভব এবং উন্মেষে সাহায্য করবে এটাই তো স্বাভাবিক। 

পৃথিবী এবং এর বাসিন্দাদের সৃষ্টির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা আমাদের ধর্ম থেকে শুরু করে প্রচলিত কাহিনিতে অনেকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ পানি হতে পারে ভূগর্ভস্থ কিংবা ভূ-উপরিস্থ। পানি একটি প্রাণহীন, রহস্যময় অতল, যেখানে থেকে জীবনের সৃষ্টি হয় বলে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্রষ্টাকে মনে করা হয় স্বাধীন; অনেকে স্রষ্টাকে পানির অংশ বলেও মনে করে। কোথাও পানিকে এমনকি স্রষ্টার বাস্তব প্রতিনিধিত্ব মনে করা হয়। বিচিত্র বিশ্বাস রয়েছে পানিকে ঘিরে। কখনও মনে করা হয় পানিতে এমন কিছু অদৃশ্য বস্তু আছে, যা জীবনের সঞ্চার করে। পানিকে ঘিরে বিচিত্র বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনার সার সংক্ষেপ মনে করিয়ে দেয় যে, পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

পৃথিবী এবং এর বাসিন্দাদের সৃষ্টির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা আমাদের ধর্ম থেকে শুরু করে প্রচলিত কাহিনিতে অনেকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ পানি হতে পারে ভূগর্ভস্থ কিংবা ভূ-উপরিস্থ। পানি একটি প্রাণহীন, রহস্যময় অতল, যেখানে থেকে জীবনের সৃষ্টি হয় বলে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্রষ্টাকে মনে করা হয় স্বাধীন; অনেকে স্রষ্টাকে পানির অংশ বলেও মনে করে। কোথাও পানিকে এমনকি স্রষ্টার বাস্তব প্রতিনিধিত্ব মনে করা হয়। বিচিত্র বিশ্বাস রয়েছে পানিকে ঘিরে। কখনও মনে করা হয় পানিতে এমন কিছু অদৃশ্য বস্তু আছে, যা জীবনের সঞ্চার করে। পানিকে ঘিরে বিচিত্র বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনার সার সংক্ষেপ মনে করিয়ে দেয় যে, পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

পানি শরীর ও আত্মাকে পরিষ্কার ও পরিশুদ্ধ করার সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন ধর্মে যেমন বর্ণনা করা হয়েছে, তেমনি আমরা পানিকে প্রাত্যহিক জীবনে পরিষ্কারক হিসেবে ব্যবহার করে আসছি। খ্রিষ্ট ধর্মে ব্যবহূত গ্রিক শব্দ 'ব্যাপ্টিজম'-এর অর্থ দাঁড়ায় ডুব দেওয়া বা ধোয়া। যেখানে পানির দ্বারা 'ব্যাপ্টিজম'কে গ্রহণ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের প্রতীক এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মকে মনে করা হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার লোক তাদের বিভিন্ন সমস্যা থেকে নিরাময় পাওয়ার জন্য ফ্রান্সের লর্ডসে তীর্থযাত্রা করে। লর্ডস তার ঝরনার পানির জন্য সুপরিচিত এবং বিশ্বাস করা হয় এ পানি অসুস্থকে সুস্থ করে তোলে। লর্ডসের এই পবিত্র পানির কাহিনি ১৮৫০ সাল থেকে সুবিদিত। বলা হয়ে থাকে সে সময় ১৪ বছর বয়সী বার্নাদেতি সেখানে কুমারী মেরিকে ১৮ বার দেখেছেন। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে জায়গাটিতে গির্জা নির্মাণ করা হয়। সে সময় থেকে বিশ্বাসীরা ওখানকার ঝরনার পানিকে রোগ নিরাময়ে কার্যকর বলে মনে করে। যে পানিকে রোগ নিরাময়ে সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হলো, যাকে ব্যবহার করে পবিত্রতা অর্জন করা হলো সে পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চয়ই ধর্মাচার পালনের মধ্যেই পড়ে। 

পানি ব্যবস্থাপনায় ধর্মশিক্ষার ব্যবহার কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে নিয়ে পরিবেশ বিষয়ে সংবেদনশীল সবার মাঝেই কৌতূহল রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতারা ২০০০ সালে জাতিসংঘে বৈঠক করেছিলেন এবং 'বিশ্ব শান্তিতে প্রতিশ্রুতি'তে স্বাক্ষর করেন। এই প্রতিশ্রুতি পত্রে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশ রক্ষার আহ্বান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক পানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক গ্রুপ কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী যেখানে ব্যবহারোপযোগী পানি এখন দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে, পানি নিয়ে হাহাকার বাড়ছেই সেখানে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা যদি পানির বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে তাতে লাভই হবে, কোনো লোকসান নেই।

বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই কোনো না কোনো ধর্ম মতকে বিশ্বাস করে থাকে এবং তাঁর শিক্ষাকে কিছুটা হলেও অনুসরণ করে। তাঁদের ধর্ম বিশ্বাস এবং জীবনাচারে তাঁর প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে যদি পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা, অপচয় প্রতিরোধ, ঝরনা, নদী, খাল-বিল রক্ষায় কাজ করে তাহলে জীবনের জন্য একান্ত অপরিহার্য পানি যেমন তার পবিত্রতা ও প্রাচুর্য ধরে রাখতে পারে, তেমনি ধর্মাচারে বিশ্বাসী তো পুণ্য ও লাভ করতে পারে। এভাবে ধর্ম শিক্ষা ও ব্যবহার থেকে সৃষ্টি হতে পারে পরিবেশ সংরক্ষণের আরেক ধারা।