গ্রাম বাংলায় একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে- 'মাঘের শীত, বাঘের ডাক' আর সেই ভয়ংকর শীতকে কাবু করতে মানুষ আগুনের তাপ পোহায়। এই পরাক্রমশালী আগুনে যদি কোনো মনুষ্য শরীর দগ্ধ হয়, তার যাতনা কল্পনাও করা সম্ভব না। কিন্তু প্রতি বছর পৃথিবীতে নানা প্রকার আগুনের শিকার হয়ে মারা যান কত মানুষ! সেই মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তের অনুভূতি কখনোই জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু সবই ঘটে গাফিলতি, অজ্ঞতা, অসতর্কতা, পরিকল্পনাহীনতা ও নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করার জন্য। 

 যে কোনো কারখানা, গোডাউন, কমার্শিয়াল বিল্ডিং, ওয়্যার হাউস, কনভেনশন সেন্টার, হোটেল, রেস্তোরাঁয় ফায়ার সেফটির জন্য প্রথম শর্ত তিনটি হচ্ছে- ১. লেআউট প্ল্যানিং, ২. ফায়ার প্রিভেনশনের সরঞ্জাম ও ৩. প্র্যাকটিস বা ফায়ার সেফটি ড্রিল প্রতি মাসে এক দিন। লেআউট প্ল্যানিংয়ের ১৫টি শর্ত- ১. আগুন ধরলে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা, ২. বের হওয়ার পথে কোনো কিছুই রাখা চলবে না, ৩. স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম থাকতে হবে, ৪. নিয়মিত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র চেক করে রাখা, ৫. প্রতি মাসে ফায়ার সেফটি ড্রিল করা, ৬. দাহ্য পদার্থ থাকলে ফায়ার ট্রিটেড ডোরের বাবস্থা থাকা এবং টেম্পারেচার মনিটর করা, ৭. কারখানা বা গোডাউনের প্রবেশ বা বের হওয়ার পথ দুটি করে অবশ্যই থাকতে হবে, ৮. কারখানা বা গোডাউনের ভেতরে প্রয়োজনে ফায়ার ফাইটার যাতে অনায়াসে ঢুকতে বা বের হতে পারে যন্ত্রপাতিসহ তার ব্যবস্থা থাকা, ৯. বিল্ডিং প্ল্যানের লেআউট প্রতিটি দেয়ালে লাগানো থাকতে হবে, ১০. কোথায় কী ধরনের পদার্থ আছে তা বড় বড় করে লেখা থাকতে হবে, ১১. বিল্ডিং কোড বা গোডাউন কোড অনুযায়ী আবাসন তৈরি করতে হবে, ১২. চারদিকে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম জলাধার থাকতেই হবে, ১২. প্রয়োজনে পাওয়ারের (বিদ্যুৎ) ইন্টারনাল মেইন সুইচ অটোমেটিক্যালি শাটডাউনের ব্যবস্থা থাকতে হবে, ১৩. এক্সটারনাল মেইন সুইচ যাতে ফায়ার ফাইটাররা ব্যাবহার করতে পারেন তারও বাবস্থা থাকতে হবে, ১৪. পাওয়ারের (বিদ্যুৎ) ইন্টারনাল মেইন সুইচ অটোমেটিক্যালি শাটডাউনের সঙ্গে সঙ্গে ১২ ভোল্টের ইমার্জেন্সি পাওয়ার দিয়ে যাতে সব আউটলেটে যাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে, ১৫. অটোমেটিক গ্রুপ ওয়াকিটকি থাকতে হবে। 

সাধারণত আগুন লাগার ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের উপাদান, জ্বালানি বা ফুয়েল হিসেবে কাজ করে, তাই আগুনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়- ১. ক্লাস 'এ' যা তৈরি হয় কাঠ, কাগজ, কাপড় বা প্লাস্টিক থেকে, ২. ক্লাস 'বি' যা তৈরি হয় অ্যালকোহল, ইথার, পেট্রোল বা গ্রিজ থেকে, ৩. ক্লাস 'সি' যা তৈরি হয় ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং বা ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি থেকে, ৪. ক্লাস 'ডি' যা তৈরি হয় সোডিয়াম, টাইটানিয়াম, জিরকোনিয়াম বা ম্যাগনেসিয়াম থেকে, ৫. ক্লাস 'কে' যা তৈরি হয় গ্রিজ বা রান্নার তেল থেকে। 

আগুন দ্বারা অঘটনকে প্রতিরোধের জন্য যা যা অবশ্যই থাকতে হবে- ক. ফায়ার স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম যা চার ধরনের হয়- ১. ওয়েট স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম, ২. ড্রাই স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম, ৩. প্রি-অ্যাকশন স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম, ৪. ডিলুজ স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম। খ. ফায়ার পিলার হাইডরান্টে দুটি জিনিস থাকে- ১. ফায়ার রিল হোশ ক্যাবিনেট ও ২. ফায়ার এসটিংগুইসার ক্যাবিনেট আবার, গ. আবার ফায়ার এসটিংগুইসার পাঁচ ধরনের হয়- ১. ওয়াটার ফায়ার এসটিংগুইসার, ২. ফোম ফায়ার এসটিংগুইসার, ৩. ড্রাই পাউডার ফায়ার এসটিংগুইসার, ৪. ওয়েট কেমিক্যাল ফায়ার এসটিংগুইসার, ৫. কার্বন ডাই-অপসাইড ফায়ার এসটিংগুইসার। ঘ. ওয়াটার ফায়ার এসটিংগুইসার চার ধরনের হয়- ১. ওয়াটার জেট, ২. ওয়াটার স্প্রে, ৩. ওয়াটার এসটিংগুইসার উইথ এডিটিভস, ৪. ওয়াটার মিস্ট বা ফগ। যে কোনো স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম বা এসটিংগুইসার অটো নক বা স্টার্ট বা ব্যবহার করা মাত্র ফায়ার অ্যালার্ম অবশ্যই বেজে উঠতে হবে।

আগুন দ্বারা অঘটন ঘটে গেলে মানুষের বের হওয়ার জন্য বিম ডিটেকটরেরও ব্যবস্থা থাকা উচিত যা ইনফ্রারেড দিয়ে কাজ করে, যা দুই ধরনের হয়- ১) এন্ড টু এন্ড বিম ডিটেকটর অটো রিসিভার ও অটো ট্রান্সমিটার থাকবে, ২. সিঙ্গেল এন্ড বিম ডিটেকটর যার ইনফ্রারেড বাতি ফ্ল্যাশ লাইটের মতো কাজ করে।

 যে কোনো কারখানা, গোডাউন, কমার্শিয়াল বিল্ডিং, ওয়্যারহাউস, কনভেনশন সেন্টার, হোটেলের মেডিকেল সেন্টার ও অ্যাম্বুলেন্স অবশ্যই থাকা উচিত, তবে তা একই প্রিমিসেসে বা বিল্ডিংয়ে না, যাতে কোনো অঘটনে মেডিকেল সেন্টার ও অ্যাম্বুলেন্সও আটকা পড়ে অচল হয়ে না পড়ে। আহত যে কাউকে মেডিকেল সেন্টার বা অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়। 

গ্যাস এসটিংগুইসার কয়েক ধরনের হয় যথা- ১. নভেক গ্যাস এসটিংগুইসার নাইট্রোজেনের সঙ্গে প্রসারাইজড লিকুইড থাকে যা উত্তাপ কমিয়ে অক্সিজেনকে আগুনের সঙ্গে মিশতে দেয় না, ২. এফএম-২০০ গ্যাস এসটিংগুইসার নভেকের মতো কাজ করে আগুন কমিয়ে দেয়, ৩. ইনারজিন গ্যাস এসটিংগুইসার নাইট্রোজেন, অর্গান ও কার্বন ডাই-অপসাইড মিশ্রণে তৈরি হয় যা শ্বাসপ্রশ্বাসে ক্ষতি না করে আগুন কমিয়ে দেয়, ৪. কার্বন ডাই-অপসাইড গ্যাস এসটিংগুইসার অক্সিজেনক লেভেলকে কমিয়ে আগুন কমিয়ে দেয়, ৫. অ্যারোসল গ্যাস এসটিংগুইসার মাইক্রো এজেন্ট ও গ্যাস রিলিজ করে আগুন কমিয়ে দেয়। 

সীতাকুণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আগুনের সূত্রপাত ঘটে সম্ভবত কমার্শিয়াল হাইড্রোজেন পারঅপাইড থেকে। এটা সাধারণত দাহ্য তরল পদার্থ না, কিন্তু কোনো কারণে যদি লিকেজ হয়ে অর্গানানিক পদার্থের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ মিশে তাহলে তার এপোথার্মাল প্রপার্টির কারণে ধীরে ধীরে ভেঙে যায়ে পানি আর অক্সিজেনে ভাগ হয় এবং সেই সঙ্গে তার তাপমাত্রাও বাড়ে যায়; এক পর্যায়ে যেয়ে সেই অর্গানিক পদার্থে আগুন ধরা শুরু করে। আর আশপাশে যদি আরও ক্যান বা জার থাকে তবে তাদেরও তাপমাত্রা বাড়ে আর ভাঙা শুরু হয় আর পাশের ক্যানগুলোতে চেইন রিঅ্যাকশনে একের পর এক চলে। শেষ পর্যায়ে গিয়ে সব মিলে সেই শক্ত কনটেনারকে ব্লাস্ট করে বিকট আওয়াজ করে বাকি কনটেনারগুলোরও একই দশা করে অনেকটা বিকট বিকট শব্দ করে চারদিকে অগ্নুৎপাত ঘটায়, আশপাশের সবকিছুকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলে। এই আগুন পানি দিয়ে নেভানো যায় না। কারণ তাতে অক্সিজেন থাকায় আগুন আরও বাড়ে। এই আগুনকে ফোম ফায়ার এসটিংগুইসার ব্যবহার করে কন্ট্রোলে আনার পর চারদিকে ওয়াটার মিস্ট বা ফগ এসটিংগুইসার ব্যবহার করে তাপমাত্রাকে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে যে আর্থিক, সামাজিক, মানসিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, সেটা হয়তো একদিন পূরণ করা যাবে; কিন্তু সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ বাহিনীর সদস্য বা ফায়ার ফাইটাররা জীবন দিলেন বা পঙ্গু হলেন বা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছেন তার ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না। কেউ মারা গেছেন বা অনেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন নানা প্রকার বার্ন (দগ্ধ) নিয়ে। 

ফায়ার সার্ভিসকে সত্যিকারে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রফেশনাল অর্গানাইজেশনে রূপান্তর করা উচিত। ঢাকা শহরে বেশিরভাগ একক মালিকানার মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংগুলোর বেজমেন্ট হয় কিচেন নতুবা গার্ডদের মেস। আর গাড়ি পার্ক করে রাস্তায়, তাহলে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলবে কীভাবে? এসব অপরাধের জন্য দ্রুত আইনে বিচার করা উচিত, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অন্যায়কারীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। যে কোনো জাতীয় দুর্যোগে আবালবৃদ্ধবনিতা- সবারই একসঙ্গে কাজ করা উচিত। সবার মনে রাখা উচিৎ, আগে আমরা মানুষ, তারপর আমাদের পেশা এবং তারপর রাজনীতি।