কিশোরী-তরুণীদের ওপর হামলা, পথে চলাফেরার সময় হেনস্তা করার ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলছে। কিছুদিন আগে নরসিংদীতে পোশাকের উসিলায় একটি মেয়েকে হেনস্তা করা হলো। এর রেশ কাটতে না কাটতেই যখন সারাদেশের মানুষ বাজেট আলোচনায় মুখর, সেই সময়ে ৯ জুন, বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের সামনে আবার এক তরুণীকে নিপীড়ন, লাঞ্ছনার শিকার হতে হলো। ১০ জুন প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা এক লোক হঠাৎ খামচে ধরে তাঁর জামা ছিঁড়ে ফেলে। এরপর গালাগাল করতে করতে চলে যায়। কিন্তু খোদ রাজপথে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এমন নিপীড়নের শিকার ওই তরুণীর চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেনি কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মেয়েদের নিপীড়ন, লাঞ্ছনার ঘটনা নতুন কিছু নয়। অতীতে বহুবার এসব নির্যাতনের ঘটনা ওই এলাকায় ঘটেছে। একবার পয়লা বৈশাখের মেলায় আসা তরুণীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে, মামলাও হয়েছে। কিন্তু দোষীদের শাস্তি তো দূরের কথা, ওরা গ্রেপ্তারও হয়নি। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে- শিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্ম ক্ষেত্রে মেয়েদের চলাফেরা, উচ্চপদে নারীর অবস্থান, ব্যবসা, রাজনীতিতে নারীর সক্ষমতা ও সাফল্য দৃশ্যমান। এমন সময়ে একশ্রেণির লোক পাল্লা দিয়ে যেন নারী পাচার, নারী নির্যাতন ও বহুমুখিন নারী ও কিশোরী-তরুণী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটিয়ে চলছে সরকার, প্রশাসন, আইন, মানবাধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। সেদিন মোহাম্মদপুরে বসবাসকারী একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা বললেন, 'আমি ওষুধ কিনতে পাড়ার ফার্মেসিতে যাচ্ছিলাম। দুপুর গড়িয়ে ৩টা-সাড়ে ৩টা হবে। পথে কোনো লোক ছিল না। উল্টো দিক থেকে একজন লোক আসছিল। আমি মাথা নিচু করে হাঁটছিলাম। লোকটা আমার সামনে এসে, মাথায় কাপড় দেস না ক্যা? বলে দুটো গালি দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল। মাথা তুলে তার মুখ আর দেখতে পেলাম না।' সালমা বলছিলেন, 'কৈশোরে আমরা বান্ধবীরা দলবেঁধে গল্প করতে করতে স্কুলে যেতাম-আসতাম। ভয় লাগত না। আমাদের সঙ্গে বাড়ির কেউ পাহারাদারের মতো থাকত না। আজ বত্রিশ বছরের আমি দশ বছরের মেয়ে নিয়ে স্কুলে যেতে ভয় পাই। মেয়েকে বলি, আমার সামনে সামনে হাঁটবে। মেয়ে প্রশ্নবোধক চোখে তাকালে আমি কী বলব, ভেবে পাই না। আমাদের তো গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই।'
একান্ন বছরের স্বাধীন বাংলাদেশে একদল লোক মেয়েদের পোশাক পরা নিয়ে মনগড়া বিশ্নেষণ হাজির করে পথেঘাটে শ্নীলতাহানির চেষ্টা করে চলছে নতুন উদ্যমে। যে দেশে মেয়েশিশু অহরহ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, সেই দেশে মেয়েদের অশালীন পোশাকের ধুয়া তোলা প্রকারান্তরে মেয়েদের লাঞ্ছিত করার অন্যবিধ পাঁয়তারা। ঠুনকো অজুহাত খোঁজার শামিল। আমরা কেন ভুলে যাই, একাত্তরে এ দেশের একদল মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চায়নি। যদি তা-ই হতো, তাহলে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান হতে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' শব্দটি বাদ যেত না। ধর্মের ধুয়া তুলে, বারবার বিভিন্ন ফতোয়া দিয়ে মেয়েদের অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ করা হতো না। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা লেখা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন করে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায় করতে হতো না। 
যুগে যুগে মেয়েদের বাইরে আসার পথ বন্ধ করার নানান রাষ্ট্রীয়-সামাজিক নিয়মকানুন চালু ছিল। সে যুগ পেরিয়েছে নারী কঠোর সংগ্রামে, অচিন্ত্যনীয় অধ্যবসায়ে, সংগ্রামে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও নারীর আছে উজ্জ্বল অংশগ্রহণ। এসব সবার জানা। প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরেও স্বাধীন দেশে, একান্ন বছরের বাংলাদেশে নারী স্বাধীনভাবে চলতে পারবে না? এ ব্যর্থতা কার? বারবার নারীর পথে কাঁটা বিছায় কারা? তাদের খুঁজে বের করা কি এতই কঠিন? অশালীন পোশাকের ধোয়া তুলে পথেঘাটে, রাস্তায়, ট্র্রেনে, বাসে নারীকে লাঞ্ছিত করা, যৌন হয়রানি করা মূলত নারীর নিজের স্বাধীনভাবে চলাফেরার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি বুঝতে মানুষকে অধিক শিক্ষিত হতে হয় না। প্রতিটি মানুষ তাঁর ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদ পরবেন। কে কেমন পোশাক পরবেন, এটা কারও নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার নেই। করলে তা হবে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন; মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। যখন এ ধরনের উন্নয়ন পরিপন্থি, অমানবিক অপরাধের ঘটনা ঘটে, তখন সমাজের উন্নয়নপ্রত্যাশী নাগরিকরা কেন তৎপর হন না? তাঁরা কি জানেন না, এসব ঘটনা দেশের উন্নয়নকে প্রশ্নবোধক চিহ্নের সম্মুখীন করে? 
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী, এ দেশের নাগরিক। নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপদে চলাফেরা সব নাগরিকের অধিকার। নারীর এই অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন। পাবলিক প্লেসে নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরার অধিকার নারীর নাগরিক অধিকার। যে কোনো ছুতোয় শরীরে থাবা দিয়ে তাঁর পোশাক ছেঁড়া দণ্ডনীয় অপরাধ। নারীর শরীর একান্তই তাঁর। কোনো মেয়েশিশু, কিশোরী, তরুণী, মধ্যবয়স্কার শরীর পাবলিক প্লেস নয়, এই সত্য জনগণকে বুঝিয়ে দিতে ইতিবাচক বহুমুখী উদ্যোগ, কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে সরকারকেই।
কাজী সুফিয়া আখ্‌তার: নারী অধিকার কর্মী, গবেষক ও লেখক।