এই যুদ্ধকালে, দুঃসময়ে ৩ জুন নাজিম হিকমতের মৃত্যুর দিনে তাঁর কবিতা, 'জেলখানার চিঠি'র এই পঙ্‌তিটি খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল। শিরোনামের 'ওঁরা' হলো তাঁরা, যাঁরা নাজিম হিকমতকে জেলে পুরেছিলেন, ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ তৎকালীন তুরস্ক সরকার এই নিষ্ঠুর কাজটি করেছিল, করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রিয়তমাকে উদ্দেশ্য করে জেলখানা থেকে যে চিঠি তিনি লিখেছিলেন, তাতে বলেছিলেন, 'তুমি বেঁচে থাকবে।' বলেছিলেন, বেঁচে থাকবেন তিনি নিজেও, কারণ সব থেকে সুন্দর সমুদ্র আজও তাঁর দেখা হয়নি, সব চেয়ে সুন্দর শিশুটি আজও বেড়ে ওঠেনি, মধুরতম যে কথাটি তাঁর বলার ছিল, আজও তা বলা হয়নি। স্বপ্নচারী কবি যেন সুদিনের কারবারি।

যে দেশ নিয়ে এত স্বপ্ন ছিল তাঁর, সে দেশ থেকে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে অন্য দেশে, না হলে মার্কিনপন্থি তুরস্ক সরকারের জেলেই কাটাতে হতো বাকি জীবন। হয়তো উঠতে হতো ফাঁসির মঞ্চে। শুধু কি নাজিম হিকমত? মার্কিন গোয়েন্দ সংস্থা সিআইএর মদদপুষ্ট সেনাপ্রধান চিলিয়ার জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করার পর তাঁরা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন বিংশ শতকের আরেক প্রধান কবি পাবলো নেরুদাকে। পালিয়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি সে যাত্রায়, কিন্তু তারপর তাঁর মৃত্যু হয় রহস্যজনকভাবে। মার্কিনপন্থি নতুন সরকার বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে হত্যা করে। তাঁর অপরাধ, তিনি কমিউনিস্ট। বস্তুত মার্কিন গোয়েন্দ সংস্থা সিআইএর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এমন হত্যা ও নিপীড়নের ঘটনার তালিকা অনেক দীর্ঘ। 

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কবি নাজিম হিকমত কিন্তু বিপ্লবী ধারার কবি হিসেবে তিনি সর্বকালের সেরা। রোমান্টিক কমিউনিস্ট হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। শিল্পের জন্য শিল্প বা কবিতার জন্য কবিতা নয় বরং মানুষের জন্য সব কিছু- এই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হলেন ছেলেবেলা থেকেই। ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন মানুষের মুক্তি হবে। স্বপ্ন দেখতেন, দরিদ্র-নিম্নবর্গের মানুষ একদিন রাষ্ট্রে তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবেন। স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম। খুব অল্প বয়সেই বুঝতে পারলেন, বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই। বুঝলেন, বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ব্যবস্থা নির্মাণের মধ্য দিয়েই পূর্ণ হতে পারে তাঁর সেই স্বপ্ন। যুক্ত হয়ে গেলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। লেখালেখি শুরু করে দিলেন বিপ্লবী ধারার পত্রিকায়। 

কিন্তু জন্মভূমি তুরস্কে তখন চলছে মার্কিনপন্থি সরকারের শাসন। যে কোনো বামপন্থি কার্যক্রম কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছিল। ১৯২৪ সালে, মাত্র ২২ বছর বয়সে বন্দি হলেন প্রথমবার। কিন্তু স্বৈরশাসক বেশি দিন রাখতে পারেনি তাঁকে জেলে। তাঁর মুক্তির জন্য বিবৃতি দিলেন, মিছিল করলেন পাবলো নেরুদা, জ্যঁ পল সার্ত্রে ও আরও অনেক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ হলো। মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার। 

মুক্তি পেয়েই সোজা চলে গেলেন রাশিয়ায়। দীক্ষা নিলেন মার্কসীয় রাজনীতির। সান্নিধ্য পেলেন কালজয়ী রুশ কবি মায়াকোভস্কির। লিখতে থাকলেন একের পর এক কবিতা। ছাপা হতে লাগল একের পর এক বই। যে বই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। বহু ভাষায় অনূদিত হলো। দেশে দেশে বিপ্লবের প্রেরণা হয়ে উঠল নাজিমের কবিতার বই। 

স্বদেশের জন্য কাজ করার মানসে ফিরে গেলেন ইস্তাম্বুলে। কিন্তু আবার বন্দি হলেন। এবার জেলে থাকলেন একটানা ৮ বছর। এই সময়েই তাঁর কলম দিয়ে বেরুলো কালজয়ী কবিতা 'জেলখানার চিঠি' যা একদিকে মর্মস্পর্শী, অন্যদিকে বিপ্লবের গভীর প্রেরণা। দেশে দেশে খোলা আকাশের নিচে, সড়ক দ্বীপে, মিছিলে আজও ধ্বনিত হয় 'জেলখানার চিঠি'। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, 'জেলখানার চিঠি'র নায়িকা শুধুই কল্পনার জগতের এক নাম না-জানা নারীর প্রতিকৃতি। মেয়েটির অস্তিত্ব ছিল কেবলই স্বপ্নে, যেন বাঙালি মার্কসীয় ভাবধারার কবি বিষুষ্ণ দের 'ঘোড় সওয়ার' কবিতার মতো, যা তিনি পেয়েছিলেন স্বপ্নে। হিকমত লিখেছেন, 'আমি কল্পনায় নির্দিষ্ট চেহারার একটি মেয়েকে দেখতে পেতাম। তাঁকে স্বপ্নে দেখতাম। তাঁকে ঘিরেই কেটেছে আমার বন্দি জীবন। তাঁকে নিয়েই লিখেছি সব কবিতা। সে-ই ছিল আমার ভালোবাসা ও প্রেরণা। এই কাল্পনিক ভালোবাসা আর প্রেরণাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে জেলখানার নির্জন প্রকোষ্ঠে।' 

হিকমত শেষবারের মতো দেশ ছাড়েন ১৯৫১ সালে। বসবাস শুরু করেন রাশিয়ায়। এক পার্টিতে দেখা হয় ভেরা নামের এক রুশ তরুণীর সঙ্গে, যে ছিল নাজিমের চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। দেখামাত্রই প্রেম। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাজিম লিখেছেন, 'বন্দি জীবনে ১৭ বছর যে মেয়েটিকে আমি কল্পনায় দেখতে পেতাম, স্বপ্নে দেখতাম, তাঁর চেহারার সঙ্গে ভেরার চেহারার হুবহু মিল, যা বিস্ময়েরও অতীত। অতএব, ভেরার প্রেমে না পড়ে উপায় ছিল না।' দেখা হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন কয়েকবার করে ফোন করা শুরু করলেন ভেরাকে। ভেরার জীবনে নাজিমের আবির্ভাবও ছিল স্বপ্নের মতো, কারণ সে শুধু নামই শুনেছে নাজিমের, রুশ ভাষায় অনূদিত কবিতা পড়েছেন, হয়তো প্রেমেও পড়েছেন কবিতার কিংবা কবির। ভেরার জন্য নাজিমের কাছে আসা এতটা সহজ ছিল না। কারণ সে ছিল বিবাহিত। কিন্তু প্রেমের তোড়ে এক সময় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বিবাহের বন্ধন। গভীর প্রেমের বন্যায় ভেসে গেল দু'জনেরই জীবনতরী। 

বিয়ে করলেন নাজিম ও ভেরা। কিন্তু আটপৌরে জীবনের মতো সংসার বাঁধা হলো না কাব্য সাধনায় বরং এক ছাদের নিচে বাস করেও প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো, যা কবিতা লেখায় আরও বেশি শক্তি জোগাল। এভাবেই চলছিল প্রেম, সংসার ও কাব্যসাধনা। কিন্তু ছন্দপতন ঘটল জীবনে হঠাৎ। বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক হলো নাজিমের। বেঁচে গেলেন সেই যাত্রা। তবে ভয় জেঁকে বসল গভীরভাবে। নাজিম অনেক দিন বাঁচতে চেয়েছিলেন শুধু ভেরাকে ভালোবেসে জীবনপাত্র পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। সেই ভয়ই সত্যি হলো। আবার হার্ট অ্যাটাক হলো। এবার আর ফিরে এলেন না কবি। ১৯৬৩ সালে এক গ্রীষ্ফ্মের রাতে বিদায় নিলেন ভেরার কাছ থেকে, বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। আর পৃথিবীর জন্য রেখে গেলেন এক কাব্যসম্ভার, যা এতই গভীর, এতই সুদূরপ্রসারী, তা ভেসে বেড়াবে কাল থেকে কালান্তরে। 

নাজিমের মৃত্যুর পর আক্ষরিক অর্থেই পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন ভেরা। প্রতিদিন কবরে কাছে চলে যেতেন তিনি। আর কথা বলতেন 'নাজিমের' সঙ্গে। এভাবে অনেক দিন চলছিল। অনেক দিন লেগেছিল তাঁর স্বাভাবিক হতে। 'নাজিমের' সঙ্গে কী কথা হতো, তা নিয়ে বের হয়েছে 'নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন' শিরোনামে যা তুর্কি ও রুশ ভাষায় পাওয়া যায়। নাজিম-ভেরার প্রেমকাহিনি রূপকথাকেও হার মানায়। তা শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনিতে জায়গাও করে নিয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে।

নাজিম হিকমতের কবিতায় দেশপ্রেম ও ব্যক্তিপ্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যেন প্রেমিকের ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের যুগলবন্দি। নাজিমের কবিতা মানুষের, বিশেষ করে, খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি কথা বলে। প্রেমিকার জন্য কবির যে ভালোবাসা, এর গভীরে থাকে মাটি ও মানুষ। ভূপেন হাজারিকার গানের মতো- 'আমি ভালোবাসি মানুষকে, তুমি ভালোবাসো আমাকে। আমাদের দুজনের সব ভালোবাসা আজ এসো বিলিয়ে দেই এই দেশটাকে।'

বাংলাদেশ ও ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে গভীর প্রেরণা ছিল নাজিম হিকমতের কবিতা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে কটি কবিতা অনুবাদ করেছেন, এর মধ্যে 'জেলখানার চিঠি' কবিতাটিই সেরা। আমাদের মুক্তি আজও হয়নি। জোড়াতালি দিয়ে চলছে সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবন। সে জন্য, মুক্তিকামী মানুষ আবার নিশ্চয়ই একদিন ঘুরে দাঁড়াবে, মিছিলে যাবে। রাজপথে, সড়কদ্বীপে হয়তো আবার শোনা যাবে নাজিমের কবিতা :'প্রিয়তমা বধূ আমার,/ তুমি লিখেছ/ ওরা যদি তোমাকে ফাঁসি দেয়,/ তোমাকে যদি হারাই,/ আমি বাঁচব না।'