'সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।' নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে কবি সুকান্ত ভট্টাচাযের্র দুর্মর কবিতার এ বাণী। সত্যিই বাংলাদেশ মাথা নোয়াতে জানে না। বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার মুক্তি এনে দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। দীর্ঘ ২৪ বছর সংগ্রাম করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন। আর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ নিষ্ঠুর রক্তক্ষরণ থেকে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা উন্নয়নে স্বাধীনতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন পদ্মা বহুমুখী প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করে। 

২০১২ সালের ২৯ জুন 'দুর্নীতির' অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। এরপর এ প্রকল্প থেকে সরে যায় এডিপি, জাইকা এবং আইডিবির মতো উন্নয়ন সহযোগীরাও। বিশ্ব মোড়লদের চোখে আঙুল দিয়ে ওই ঋণ প্রস্তাব বাতিলের দশ দিনের মধ্যে ২০১২ সালের ৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মূল সেতুর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ভিত রচিত হয় স্বনির্ভর উন্নয়নের, স্বনির্ভর বাংলাদেশের। ২৫ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন স্বনির্ভরতার বাস্তব চিত্র পদ্মার পলি-পানির ওপর দৃশ্যমান হবে। সব ষড়যন্ত্র পদ্মার অতল জলে নিমজ্জিত হবে। 

২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের অনুরোধ কথিত পদ্মা সেতু দুর্নীতির তদন্তে নামে কানাডিয়ান পুলিশ ওই দেশের কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে। পাঁচ বছরের বেশি সময় বিচার প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতু সংক্রান্ত মামলা খারিজ করে দেন এই বলে অভিযোগের তথ্য 'অনুমানভিত্তিক এবং গুজব'। 

৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা নিজস্ব ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতুই নয়, উন্নয়নের অন্যান্য ক্ষেত্রের অর্থায়নেও বাংলাদেশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবি প্রভৃতি স্বার্থভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্থার ঋণ বা অনুদান একটি দেশকে উন্নয়নে পরনির্ভরশীল করে তোলে। প্রকৃত বা টেকসই উন্নয়নের পরিপন্থি হয়ে ওঠে এসব ঋণ বা অনুদান। বিদেশি দাতা সংস্থার ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী, কারিগরি সহায়তা বাবদ ও সুদ বাবদ বিশাল পরিমাণ অর্থ আবার তাদের পকেটে চলে যায়। জনগণের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ে, ঋণ পরিশোধে দেশের বিনিয়োগ ও সেবা খাত ব্যাহত হয়। অর্থাৎ উন্নয়নে স্বার্থহানি ঘটে, উন্নয়নে স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতা থাকে না। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, উন্নয়ন মানে শুধু দেশের আয় ও ধনসম্পদ বৃদ্ধি নয়, বরং উন্নয়ন প্রকৃত অর্থবহ হয় স্বাধীনতায়, উন্নয়ন মানেই হচ্ছে স্বাধীনতা! ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে তাঁর নোবেল পাওয়ার কৃতিত্বও এ ভাবনায়। অমর্ত্য সেনের মতে, দরিদ্র দেশের মানুষের স্বাধীনতা নেই, তাই তারা দরিদ্র। আর এ কারণেই অতীতে এই দেশগুলোকে অনেক বিদেশি অর্থনৈতিক সাহায্য ও অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েও তাদের উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে অমর্ত্য সেনের ভাবনাই পরিস্টম্ফুটিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতাই এখন সক্ষমতার বাংলাদেশ। উন্নয়নে স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতার স্বাদ তিনিই প্রথম দিলেন পদ্মা সেতু নির্মাণ করে।