২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়ে গেছে। এটি সেই সেতু, যার প্রতিটি পিলার ও স্প্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, আত্মঅহংকার এবং ভালোবাসার অপূর্ব নিদর্শন। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পকে যেভাবে তুলে ধরেছে, তা অবাক করার মতো। সত্যিই প্রতিটি ইটের খবর জেনেছে বাংলাদেশের মানুষ। শুধু তাই নয়, এটি নিয়ে দেশি-বিদেশি বহুমুখী যে ষড়যন্ত্র ছিল তার নাগপাশ ছিন্ন করে, কুচক্রী মহলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বে আজ পদ্মা সেতু বাস্তব। তা দেখে মাথা বিগড়ে গেছে একটি মহলের। পদ্মা সেতুর এ বাস্তব রূপ দেখে তারা এখনও পাগলের প্রলাপ বকে চলেছে। মাত্র ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের হাত ধরে আজ বাংলাদেশ স্বগর্বে মাথা উঁচু করে পৌঁছে গেছে উন্নত দেশের দ্বারপ্রান্তে। এদেশের স্বপ্নের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এপপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ মেগা প্রকল্পগুলো দেখে তাদের যেন আঁতে ঘা লেগেছে।

অত্যন্ত উদ্বেগ ও দুঃখের সঙ্গে পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বয়ং এখনও পদ্মা সেতু নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য সংমাধ্যমে প্রকাশ করছেন, যা অতি নিন্দনীয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। কিন্তু বহুমাত্রিক বিদেশি ষড়যন্ত্র ভেদ করে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে এ দেশের আপামর মানুষ তাঁর পাশে থেকে এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেছেন এবং আজ পদ্মা সেতু আমাদের গর্বের প্রতীক। স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে পদ্মা সেতু বাস্তবে পরিণত হয়েছে এবং উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাংকও পরবর্তী সময়ে তাদের ভুল স্বীকার করেছে তা আমাদের সকলেরই জানা।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া পদ্মা সেতু নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ২০১২ সালের শেষের দিকে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণদানে অস্বীকৃতি জানানোর সময়ে একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে এবং প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার নির্দেশনা প্রদান করেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় অর্থাৎ ২০১৩ সালের মার্চে দাপ্তরিকভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র না থাকলে সেতুর কাজ আরও আগে শুরু করা যেত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহূত হচ্ছে, যা সরবরাহ করা আমাদের দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নেই এবং তারা কেবল রাস্তা নির্মাণের জন্য উপযুক্ত। এ কারণে বিদেশি বৃহৎ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞে আমাদের দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো উপঠিকাদার হিসেবে যোগ দিয়ে কাজ শুরু করে। এই অত্যাধুনিক নির্মাণসামগ্রী ও সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে সকল পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় মূলত পদ্মা সেতুর ব্যয় প্রাক্কলিত হিসাবের চাইতে বেশি প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত যৌক্তিক।

দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অধিক ব্যয় করা হয়েছে বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তারা জেনেবুঝেই এ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে আমরা মনে করি। কারণ, এই প্রকল্পে একটি বৃহৎ অংশের জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, মূল সেতুতে রেললাইন সংযোজন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সেতুর ব্যয় সংগত কারণেই সামান্য বাড়িয়েছে। ব্যয় কিছু বাড়লেও মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হয়নি পদ্মা সেতুতে। বিশ্বমানের সর্বোচ্চ মানসম্মত উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এখানে।

একটি দেশের উন্নতির জন্য তার অবকাঠামোর উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে রাজধানীসহ পুরো দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই সেতু কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, আজ তা একজন সাধারণ মানুষও বলতে পারে। পদ্মা সেতুর সঙ্গে রেল সেতু প্রকল্প যুক্তকরণ আরেকটি মাইলফলক। আমরা জানি ওই পাড়ের মানুষ, যাঁরা প্রতিনিয়ত সারাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে চলাচল করবেন তাঁদের জন্য রেল যোগাযোগ কতটা সাশ্রয়ী।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিদেশি ঋণ না পাওয়াকে বিএনপি ব্যর্থতা হিসেবে বলছে, কিন্তু এই না পাওয়া কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং এই ষড়যন্ত্রের ঋণ না পেয়েই আমরা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি এবং পেয়েছি আমাদের স্বপ্নের সেতু।

পদ্মা সেতুর প্রতিটি ইঞ্চি তৈরি হয়েছে জনগণের টাকায় আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও মেধাবী বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, যা আজ পুরো বিশ্বে সমাদৃত। পদ্মা সেতু আজ আর শুধু সেতু নয়, এ সেতু বাঙালির আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক। বিশ্ববাসী আজ চেয়ে চেয়ে দেখছে বাংলাদেশের উন্নয়ন। তারা দেখছে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করে মহাশূন্যে উড্ডয়ন করতে হয়। তারা দেখছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কীভাবে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের এত উন্নয়ন, এত অর্জন, এত সক্ষমতা তাদের সহ্য হয় না। শুধু এই উন্নয়ন দেখেই পদ্মা সেতু নিয়ে একটি মহলের এত গা জ্বলে। দেশের সক্ষমতায় তারা ঈর্ষান্বিত হয়। তাদের গা জ্বলুক, তাদের ঈর্ষা হোক- এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।

পরিশেষে বলা যায়, এটিই প্রমাণিত হয়- যতদিন শেখ হাসিনার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

সিলভীয়া পারভীন লেনী, আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির সদস্য