আমাদের এক বন্ধু কয়েকদিন আগে তার বাঁ পায়ের গোড়ালিতে চোট পায়। ডাক্তার তার পায়ে চার সপ্তাহের জন্য প্লাস্টার করে দেয়। কিন্তু তাতে 'অস্বস্তি' লাগায় কয়েকদিন পরেই ভদ্রলোক সেই ব্যান্ডেজ কেটে ফেলে। বাঁ পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা থাকায় সে তার শরীরের ওজন বেশিরভাগই সময়ই ডান পায়ে রাখতে শুরু করে। এ রকম কয়েকদিন চলার পর, অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এবার তার ডান হাঁটুতে খারাপ ধরনের চোট লাগে। এখন তাই দুই পায়েই গুরুতর জখম নিয়ে হাঁটাচলা বাদ দিয়ে বেচারাকে একটি দীর্ঘ এবং আরও জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

আমার বন্ধুর এই অবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা মিলে যায়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ জাহাজ মাশুল ও পরিবহন ভাড়া, সরবরাহ শৃঙ্খলায় বিভিন্ন সমস্যা এবং মার্কিন ডলারের তেজিভাব- এসব কারণে আমাদের জাতীয় বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ঘাটতি অনেক বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন দেশ এই ধরনের পরিবেশে সাধারণভাবে দুটি নীতি সমাধান ব্যবহার করছে :

১. সুদের হার বাড়িয়ে আমদানি চাহিদা নিরুৎসাহিত করা এবং

২. প্রয়োজনীয় মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে ডলারের বিপরীতে বিনিময় মূল্যেকে নতুন ভারসাম্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন, কেউ যদি ১,০০০ দামের একটি বিলাসবহুল ভোগ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে চায়, তাহলে তাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য হয় তার 'ভোক্তা ঋণ' এর সুদের হার ৯% থেকে ১৫%-এ পুনর্নির্ধারিত করতে হবে অথবা প্রযোজ্য ডলার-টাকা বিনিময় হার ১০% বা প্রয়োজনীয় মাত্রায় বাড়িয়ে দিতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই, আমদানি করা ভোগ্যপণ্যটির চূড়ান্ত মূল্য টাকার হিসাবে অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং ফলে তার ক্রেতা পণ্য আমদানির সিদ্ধান্তটি বাতিল করতে পারে। যখন হাজার হাজার ভোক্তা এ রকম আমদানি আদেশ বাতিল করবে, তখন দেশের মোট আমদানি চাহিদা এবং বাণিজ্য ঘাটতি দুই-ই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ভোগ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে, নির্বাচিত পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক্ক বা এলসি মার্জিন বাড়ানোর মতো রাজস্ব নীতি অবলম্বন করে এ রকম কাঙ্ক্ষিত ফল সময়মতো পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশে আমরা এখনও দুটি নীতি-সমাধানের একটিকেও সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারিনি। প্রথমত, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সব ধরনের ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার সর্বোচ্চ ৯% নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি সুদের হারের ব্যবহারিক উপযোগিতা এবং সার্বিকভাবে আর্থিক নীতির প্রয়োগ মোটামুটিভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ব্যাংক ঋণের সুদের হার স্থির নির্ধারিত হওয়ায়, জাতীয় চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় পুরো চাপ ডলার-টাকা বিনিময় হারের ওপর এসে পড়ে। প্রাথমিকভাবে আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে টাকার মূল্যমান ধরে রাখার চেষ্টা করি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। রিজার্ভ কমতে শুরু করলে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন মেনে নেওয়ার বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৮৭ থেকে ৯৩-এ চলে গেছে যখন কার্ব মার্কেটে বিনিময় হার প্রায় ৯৮-এ এসে দাঁড়িয়েছে (সর্বোচ্চ ১০৩-এ স্পর্শ করে এসে)। যতটুকু দরকার, টাকার অবমূল্যায়ন ততটুকুই হয়ে গেছে এমনটা এখনও বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমানের উন্নতি সবচেয়ে জরুরি বিবেচিত বিষয় বলে মনে হয়। ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯% নির্ধারণ করায় প্রকৃতপক্ষে উচ্চবিত্ত ও বড় শিল্পপতিরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে এবং তা আসছে নিম্ন আয়ের মানুষের (অর্থাৎ ব্যাংক আমানতকারীদের) স্বার্থহানির মাধ্যমে। 

ব্যাংক ঋণের সুদের হারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ায় বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পের উদ্যোক্তাদের (যারা উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর) সুদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু এই নীতি বলবৎ করতে গিয়ে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর আমানতকারীদের দেওয়া সুদের হার অনেক কমিয়ে দেয়। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বারবার হস্তক্ষেপের পরেও ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সুদের হার সংগত কারণেই ততটা বাড়াতে পারেনি। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীরা উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি এবং আমানতের ওপর কম সুদের হারের কারণে ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে।

 ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯% নির্ধারিত হওয়ায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ে ঋণ দেওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছে। কারণ অন্যান্য খাতের তুলনায়, ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ে সর্বোচ্চ ৯% সুদের হারে ঋণ দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মুনাফা করতে পারে না। 

যদিও অন্যান্য দেশের মতো টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন অনিবার্য, কিন্তু ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার বাড়ানোর পরিবর্তে শুধু টাকার অবমূল্যায়ন করার নীতি বেছে নিলে তা দেশের উচ্চবিত্তদের বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনমান কমায়। 

কারণ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বেশি হলে তা তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানিমুখী ব্যবসাগুলোর আয় এবং মুনাফার পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিপরীতে, টাকার মান পড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত নিত্যপণ্যের দাম স্থানীয় বাজারে টাকার হিসাবে বেড়ে যায় এবং এতে নিম্ন বা সীমিত আয়ের পরিবারগুলো অনেক বেশি মুদ্রাস্ম্ফীতির চাপে পড়ে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ৯% ব্যাংক ঋণের সুদ হারের সীমার মতো, শুধু টাকার অবমূল্যায়নের ওপর নির্ভর করা নীতি, সমাজে সাধারণভাবে আয়-বৈষম্য বাড়ায়। তাই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, ডলারের বিপরীতে টাকার প্রয়োজনীয় অবমূল্যায়নের মতো ব্যাংক ঋণের সুদ হারের বাজারনির্ভর সমন্বয় করাটাও সমানভাবে জরুরি। 

বিশ্ব এখন একটি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি অসুবিধা মেনে নিতে হতে পারে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের দিকে এক নজরে দেখলে বোঝা যায় যে তারা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় উভয় হাতিয়ারই (সুদের হার এবং বিনিময় হার) ব্যবহার করছে।

 বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এগিয়ে যেতে আমাদের দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং অবিলম্বে সুদের হার ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজার সম্পর্কিত নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিচক্ষণ ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশের- আমাদের এখন এ রকম আর একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

বিষয় : অর্থনৈতিক অবস্থা বিলাসবহুল ভোগ্যপণ্য টাকার অবমূল্যায়ন

মন্তব্য করুন