গত ২৬ জুন গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেল, রুয়ান্ডার কিগালিতে কমনওয়েলথের একটি অনুষ্ঠান চলাকালে আলাদা একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১ লাখ রোহিঙ্গাকে যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসনের জন্য। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য যদি ১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে পুনর্বাসন করে, তাহলে তারা আরও উন্নত জীবন পাবে এবং বাংলাদেশেরও অন্যায্য ভার লাঘব হবে। প্রতিউত্তরে বরাবরের মতোই রোহিঙ্গাদের মহানুভবতার সঙ্গে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আরও আলাপে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা জানান এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একটা আশ্বাসের বাণী শোনা গেল, যুক্তরাজ্য আসিয়ান ও জি৭ জোটের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে মিলে মিয়ানমারের ওপর এ বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করবে। কিন্তু আসলেই কি যুক্তরাজ্য মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে নাকি শুধু বলার জন্যই বলা! যুক্তরাজ্য যদি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে কোন গ্রাউন্ড থেকে করতে পারে, কী ধরনের তার কোনো প্যারামিটার অন্তত বিগত পাঁচ বছরে দৃশ্যমান ছিল না। যুক্তরাজ্যের মতোই বিগত ৫ বছরে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বিশেষত চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে দেখা গেছে নীরব ভূমিকায়। বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে এটা ভাবাটাই স্বাভাবিক কি, রোহিঙ্গাদের সব চাহিদা পূরণে দায়িত্ব যেন শুধুই বাংলাদেশের!

এখন আসা যাক, রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার হীনষড়যন্ত্র চলছে। ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, ৪৯ দিনে ভারত থেকে পালিয়ে ৩০০ রোহিঙ্গা পরিবারের ১ হাজার ৩০০ সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ১ মার্চ ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এসেছে, আন্দামান সাগরে ভাসমান একটি নৌকা থেকে ৮১ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে উদ্ধার করার পর ভারত সরকার এখন তাদের আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাইছে। ২০২২ সালের ৮ জুন আরও একটি প্রতিবেদনে এসেছে, থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুসহ ৫৯ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা বলে এখানে নিয়ে আসার কৌশল হাতে নিয়েছে একাধিক বেসরকারি সংস্থা। জানা যায়, মিয়ানমারের রাচিদং থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা ৫৯ রোহিঙ্গাকে আটক করে থাইল্যান্ডের পুলিশ। এই ধরনের ঘটনা থেকে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান, বিভিন্ন সময়ে নানান দেশে গ্রেপ্তারকৃত বা খুঁজে পাওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর হীন প্রচেষ্টা চলমান এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল হলো বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেই প্রতিষ্ঠা করার। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক মহল বেশি সোচ্চার। এটা বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত। 

২০ জুন 'নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী' নামের ব্যানারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে 'গো হোম' কর্মসূচি পালন করে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেই ডাকা, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে আরাকানের গ্রামে গ্রামে প্রত্যাবাসন, প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত প্রত্যেক চুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ওআইসি, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, বাংলাদেশ, এনজিও, সংশ্নিষ্ট সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা, বার্মার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ১৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর আগেও একই দাবিতে নিহত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুলল্গাহর নেতৃত্বে ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট মহাসমাবেশ হয়েছিল। সেই সময় থেকে বর্তমান অবধি আন্তর্জাতিক মহলের এই দাবিগুলো মানার বিষয়ে পাওয়া যায়নি যথেষ্ট সমর্থন। আরও একটি বিষয়ে নজর দেওয়া যাক। গত ৩ জুন মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার তাদের সম্ভাব্য সংখ্যালঘুনীতি নিয়ে তিন পৃষ্ঠার এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেয়, সামরিক জান্তাকে উৎখাত করে ক্ষমতায় যেতে পারলে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সসম্মানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়, এই ছায়া সরকারের মূল চেতনায় আছেন অং সান সু চি, যার বেশিরভাগ সদস্যই এনএলডির। ২০১৭ সালের আগস্টে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালানো হয়, তখনও এই অং সান সু চিই ছিলেন মিয়ানমারের ক্ষমতায়। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানিতে তার নির্লিপ্ততা, রোহিঙ্গাদের প্রতি হীনমন্যতা এবং 'রোহিঙ্গা' শব্দকে এড়িয়ে যাওয়ার হীন প্রচেষ্টা দেখেছে সারাবিশ্ব। তাই ছায়া সরকারের এই ধরনের আশ্বাস তাদের আন্তর্জাতিক আকর্ষণ লাভ ছাড়া সেটা যে রোহিঙ্গাদের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের অতীত কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, তারা ক্ষমতায় গেলেও যে রোহিঙ্গাদের জন্য সুবিধাজনক হবে সে আশায় গুড়েবালি। 

গত ২৮ এপ্রিল গণমাধ্যমের মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর প্রভাবসংক্রান্ত একটি সরকারি প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পাওয়া আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে মর্মে প্রকাশ করা হয়। সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের পর থেকে প্রতি বছরই রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২১ সালে ৯৪ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়। ২০২০ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিংসঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ৮৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি মেলে ৬০ কোটি মার্কিন ডলারের। আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সহায়তা এভাবে কমতে থাকায় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যয় বেড়ে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ক্রমাগত এই ধরনের ব্যয় নির্ভার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোহিঙ্গাদের তাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করা জরুরি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন এবং তাদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদাসীনতা, মিয়ানমারের ওপর দৃশ্যত কোনো চাপ প্রয়োগ না করা এবং মিয়ানমার সরকারের নানা রকম তালবাহানা দেখে অবস্থাটাই এমন যে, রোহিঙ্গাদের সব মানবিক অধিকার পূরণের দায়ভার যেন শুধুই বাংলাদেশের।