শিক্ষাজীবন শেষে ছাত্র হয়তো সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত; কিন্তু প্রিয় শিক্ষককে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো, কখনও কখনও পা ছুঁয়ে সালাম করা কিংবা পদধূলি নেওয়া এই শিষ্টাচার আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি। কিন্তু এখন বিজ্ঞান পড়াতে গেলে ছাত্র হিংস্র হয়ে ওঠে। হৃদয় মণ্ডল আক্রান্ত হয়েছেন ছাত্র দ্বারা কয়েক মাস আগে।

শিক্ষকের ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না ছাত্র; পিটিয়ে মেরেও ফেলছে শিক্ষককে। নড়াইলের মির্জাপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা গলায় দিয়ে ঘোরানো হয়েছে। কাজটি যিনি সংগঠিত করতে ভূমিকা রেখেছেন তিনি স্বপন কুমার বিশ্বাসের একসময়ের ছাত্র। সাভারের আশুলিয়ায় হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তাঁরই স্কুলের ছাত্র। ছাত্র জিতু বখাটে; ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করত। তাকে শাসন করার অপরাধে প্রাণ হারিয়েছেন শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার।


২৬ জুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা চত্বরে প্রতীকী অনশন করেছেন। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা নবাব আব্দুল লতিফ হলে রসায়ন বিভাগের ছাত্র মুন্নাকে হল থেকে বের করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম বলছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন করে ছাত্রলীগ। সিট বাণিজ্য, হল থেকে বের করে দেওয়া সবকিছুই করে তারা।

ড. ফরিদউদ্দিন বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয় এবং প্রতিবাদহীনতা চলছে। এ পরিস্থিতি সর্বত্র; বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। গত বছরের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের প্রভোস্ট ড. মো. সেলিম হোসেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে- প্রচণ্ড মানসিক পীড়নে মৃত্যু হয়েছে এ শিক্ষকের। সেখানেও সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ চারজনকে বহিস্কার করেছে। ৪০ জনকে শাস্তি দিয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে।


সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষককে নিপীড়ন করা হচ্ছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। চাঁদপুরে হৃদয় মণ্ডলকে লাঞ্ছিত করার পেছনে কোচিং করা, স্কুলের গ্রুপিং কাজ করেছে। সেখানে ছাত্রদের একাংশকে উস্কে দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞান শিক্ষার বিষয়াবলি নিয়ে। নড়াইলের মির্জাপুরে ওই কলেজের অধ্যক্ষের পদটি নিয়ে লড়াই চলছিল অনেক দিন। এ দুই স্থানে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধিপত্য বিস্তারে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের পূর্ণ আধিপত্য ধরে রাখা, সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজির হাত ধরে।

শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক লাঞ্ছনার এই ঘটনাবলি সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্র রাজনীতি হয়ে ওঠে সহিংস। একসময়ে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় শিক্ষক রাজনীতি। লাল, নীল, গোলাপি, সাদা- নানা বর্ণে বিভক্ত হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জাতীয় রাজনীতির রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে নিজেদের পরিচিত করেন। উপাচার্য, অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আর নীতি-আদর্শবান হিসেবে পরিচিতি লাভ করা শিক্ষাবিদদের হাতে থাকেনি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তিনবার ভিসি প্যানেলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরও কোনো সরকারই তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়নি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় অজান্তেই শিকড় গেড়েছে অনৈতিকতা।

মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের ছাত্র রাজনীতি আদর্শ দ্বারা মোড়ানো ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ছাত্র রাজনীতি আদর্শবিহীন ধারায় পরিচালিত হয়ে এখন নিঃশেষপ্রায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগে ভালো ছাত্র আর ভালো রেজাল্ট হলেই চলবে না; থাকতে হবে দলীয় আনুগত্য। এই ধারাবাহিকতায় নৈতিক মূল্যবোধের স্থানটি হয়ে গেছে সংকুচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, কলেজের অধ্যক্ষ জানেন, তাঁর চেয়েও শক্তিবান তাঁরই শিক্ষাঙ্গনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সভাপতি। ইচ্ছা করলে ওই সভাপতি তাঁকে বিপদে ফেলতে পারেন যখন তখন। এ জন্য শুধু বর্তমান সরকার নয়; যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতা দখল করেছে; তারাই করেছে এ কাজ। যে শিক্ষাঙ্গন একসময়ে ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার; সেই শিক্ষাঙ্গনে এখন বিজ্ঞান শিক্ষক নিগৃহীত হন সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সৃষ্টিতে অক্ষম শিক্ষাব্যবস্থাই এ জন্য দায়ী বহুলাংশে। দায়ী মূল্যবোধহীন ভোগবাদিতার প্রতিযোগিতায় গড়ে ওঠা সমাজ।

আজকের যে শিক্ষক প্রতিবাদহীন; নিজেই জানেন না- আগামীকাল তিনিও হতে পারেন আক্রান্ত। অমানবিক, নিষ্ঠুর এই রাজনীতি এ অঞ্চলে বপন করেছিল ব্রিটিশরা ক্ষমতা সংহত এবং দীর্ঘায়িত করার স্বার্থে। তার বিরুদ্ধে লড়াই যে হয়নি, তা নয়। লড়াই হয়েছে বলেই সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বড় অস্ত্র বিজ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জাগরণ, নৈতিকতা ও আদর্শবোধের চর্চা। আজকের বাংলাদেশে এই উপাদান নিয়ে কাজ করার সংগঠনগুলো আর আগের মতো সক্রিয় নয়। যেখানে এই সংগ্রাম বিস্তার লাভ করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে হয়েছে সংকুচিত। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে একটা আপসকামিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ, কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতিদান এই আপসকামিতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

শিক্ষা, শিক্ষক ও ছাত্রসমাজকে বাঁচাতে আজ প্রয়োজন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জাগরণ, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সৃষ্টির সংগ্রাম, নৈতিকতা ও আদর্শবোধের চর্চা। এটি শাহবাগ চত্বরে আটকে রাখার বিষয় নয়। এর উদ্যোক্তাদের দেশব্যাপী কাজ করতে হবে সমন্বিতভাবে সংগঠিত হয়ে।

রুস্তম আলী খোকন: সাবেক ছাত্রনেতা