শিখনফলভিত্তিক শিক্ষাক্রম যা আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) শিক্ষাক্রম হিসেবে বহুল পরিচিত। আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীর জ্ঞানীয় অর্জন পরিমাপের পাশাপাশি তার দক্ষতাগত অর্জন এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত অর্জনকে সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা যায়। বলাবাহুল্য, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরির বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে যেমন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু গুণগত মানসম্পন্ন ও দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির দিক থেকে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। যে কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে অসংখ্য বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে মধ্যম সারিতে এখনও আমরা আমাদের মেধাশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, উচ্চ শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ঘাটতি, উচ্চ শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অপ্রতুলতা, গতানুগতিক শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়া অনুসরণ, শিক্ষার্থীদের প্রায়োগিক দক্ষতার অভাব ইত্যাদি। এই সমস্যা মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে। সাম্প্রতি গৃহীত পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে, বাংলাদেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তব দক্ষতানির্ভর আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন।

আউটকাম বেইজড এডুকেশন বা শিখনফলভিত্তিক শিক্ষাক্রম কী এবং কীভাবে এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা যাবে- এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কর্মশালার আয়োজন করেছে। কর্মশালাসমূহ স্বল্পমেয়াদি হওয়ার কারণে, শিক্ষকগণের মাঝে এ শিক্ষাক্রম যথাযথ বাস্তবায়ন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ও দক্ষতা তৈরি হয়নি, যা আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অন্তরায় হতে পারে। প্রথমেই যে বিষয়টি সম্পর্কে সকলের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে তা হচ্ছে আউটকাম। আউটকাম মূলত লার্নিং আউটকামকে বোঝায়, যার বাংলা প্রতিশব্দ হলো শিখনফল। শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায়, শিখনফল হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী চলমান শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম/ কোর্স/ শিক্ষাস্তর শেষে শিক্ষার্থী কি জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা হয়, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বর্ণনা। 

শিখনফলের ধারণার সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। কেননা শিক্ষাগ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীর আচরণের যে পরিবর্তন ঘটে, তা পরিমাপ করা হয় অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিমাপের মাধ্যমে। তাই শিক্ষন-শিখন প্রক্রিয়ার ফলে শিক্ষার্থীর জ্ঞানীয় অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে এটাই প্রত্যাশিত। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক পর্যায়ে পঞ্চম শ্রেণিতে- পরিবেশ দূষণ- এ অধ্যায়টির শিখনফল হলো, এই পাঠ শেষে শিক্ষার্থী পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনা করতে পারবে (জ্ঞান), পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে (দক্ষতা) এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ (দৃষ্টিভঙ্গি) করবে। তার অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা যদি আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম অনুসরণ করি তাহলে শিক্ষার্থী প্রথমত, পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষাক্রম অনুসরণ করার ফলে আমরা শুধু জ্ঞানীয় অর্জনকেই পরিমাপ করে যাচ্ছি পরীক্ষার মাধ্যমে, শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন মূল্যায়নে তেমন দৃষ্টিপাত করা যাচ্ছে না। যে কারণে আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে যাতে আমরা জ্ঞানীয় অর্জন পরিমাপের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর দক্ষতাগত অর্জন এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত অর্জনকে সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ ও মূল্যায়ন করতে পারি।

আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর জ্ঞানীয় পরিবর্তনের পাশাপাশি দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কী কী পরিবর্তন আসবে তা সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত থাকে। পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসবে যেখানে শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পাঠ্যবিষয়বস্তু অনুযায়ী কীভাবে শিক্ষক মূল্যায়ন করবেন, তা বর্ণিত থাকবে। যে কারণে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক হবে এবং শ্রেণিকক্ষে বা শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর অর্জিত দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়িত হবে। এই শিক্ষাক্রম অনুসরণ করতে হলে শিক্ষকগণকে শিক্ষন-শিখন প্রক্রিয়া ও শিক্ষার্থী মূল্যায়নে তাঁর গতানুগতিক ধারায় পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকগণ তার নিজ কোর্স শেষে শিক্ষার্থী কি দক্ষতার অধিকারী হবে এবং তাদের কর্মজীবনে এর কী সংশ্নিষ্টতা থাকবে সে সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। শিক্ষার্থী নিজেও সেই শিক্ষাস্তর/কোর্স অধ্যয়ন শেষে কী কী যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করবেন সেটা জানবে এবং নিজেকে যোগ্য ও দক্ষ করে তুলতে সচেষ্ট হবে। তাই আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাথীদের মধ্যে দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে অবিলম্বে সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম বেইজড এডুকেশন শিক্ষাক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা তাই এখন সময়ের দাবি।

বিষয় : শিখনফলভিত্তিক শিক্ষাক্রম আউটকাম বেইজড এডুকেশন মো. আহমেদুল আজম

মন্তব্য করুন