জীবন কী? এটা সম্পর্কে জ্ঞানী-গুণীরা অনেকে অনেক কথা বলে গেছেন, বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে একে সংজ্ঞায়িতও করেছেন। আমি সেগুলো এখানে নাই বা উল্লেখ করলাম। সোজা ভাষায় আমার কাছে জীবন হলো আত্মা, যার অস্তিত্ব শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। তাই অনেকে বলে থাকেন, নিঃশ্বাসের নাই কোনো বিশ্বাস। যার অর্থ অনেকটা এমন দাঁড়ায়, জীবন এই আছে তো এই নাই। প্রকৃতি এ কী যে এক জটিল সমীকরণ! প্রস্থানের ক্ষণটা কিন্তু কেউ কোনোদিন নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। তাই তো আমরা বলি মানুষ আশায় বাঁচে, আগামীর আশা বা আগামীকালের আশা। প্রতিটা দিন আমাদের কাছে নতুন আশা নিয়ে আবির্ভূত হয়। অনেক আশাকে ভাষায় এবং কর্মে রূপান্তরিত করা যায়, আবার অনেককে যায় না। যে আশাটুকুকে কর্মে রূপান্তরিত করা যায় সেটাকে সুকর্মে রূপান্তরিত করুন, আপনার সেই সুকর্মের মাধ্যমেই আপনি চিরজীবী হয়ে থাকবেন সবার মধ্যে।

বাস্তবতার নিরীখে আমাদের জীবনকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়- যেমন ছাত্রজীবন, কর্মজীবন এবং পরিবার জীবন। এর যে কোনোটিতেই আপনি আপনার কর্মের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারেন, হতে পারেন একজন আদর্শ ছাত্র, একজন সৎ অফিসার বা একজন উপযুক্ত পিতা-মাতা। এ পৃথিবীতে সুকর্মের যেমন অনেক ক্ষেত্র আছে, ঠিক তেমনি কুকর্মেরও অনেক ক্ষেত্র আছে। আপনি কীভাবে মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবেন, তা আপনার পছন্দ বা নির্ধারণ। এই লেখাটা যখন শুরু করেছি, ঠিক তার কিছু পরে এক বন্ধু আমার বাসায় বেড়াতে এসেছিল, ১৫-২০ মিনিট গল্প করার মাঝে সে একটা এসএমএস পেয়ে কেঁদে উঠল। বলল, তাঁর বাবা এই মাত্র বাংলাদেশে প্রয়াত হয়েছেন। মনে পড়ে গেল মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতার বিখ্যাত সেই ক-লাইন, 'জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?' 

আমরা কে কতদিন বাঁচব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে গড় আয়ু বলে একটা কথা প্রচলিত আছে জাতীয় অর্থনীতিতে, যার অর্থ দাঁড়ায় এমন যে, একটা দেশের মানুষ গড়ে নির্দিষ্ট কিছু বছর বেঁচে থাকে, যেমন বাংলাদেশের মানুষ গড়ে ৭৩ বছর বাঁচে, ফিনল্যান্ডের মানুষ বাঁচে গড়ে ৮২ বছর। তবে এখন সবাই একটা বিষয়ে একমত, একটা দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের সঙ্গে সে দেশের গড় আয়ুর একটা সম্পর্ক আছে। উন্নত দেশগুলোতে মানুষ গড়ে বেশি বছর বাঁচে আর অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাঁচে অপেক্ষাকৃত কম বছর। গড় একটা অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট ধারণা। কারণ একটা দেশের গড় আয়ুর চেয়ে কেউ বেশি বাঁচতে পারে আবার কেউ কমও বাঁচতে পারে। দিনের গণনায় ৭৩ বছর মানে (৭৩ী৩৬৫) ২৬,৬৪৫ দিন। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু দিনের হিসেবে ২৬,৬৪৫ দিন। দিনগুলো চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবন ভান্ডারও ছোট হতে থাকে। 

আমাদের জীবনটা বেশ ছোট তাই না! জীবনের এই দিবস ভান্ডারের হিসেবের মধ্যে আছে শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ় এবং বার্ধক্য। যৌবন এবং প্রৌঢ়ে কর্তৃত্ব করে আমাদের কর্মজীবন। এই কর্মজীবনের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ তার আত্মার প্রস্থানের পরেও যুগ যুগ স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে মানুষের মাঝে। চেষ্টা করুন প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাস, প্রতি বছর কিছু নিঃস্বার্থ কাজ করতে। এতে হয়তো আপনি ধনে ধনী হবেন না, তবে মনে, মানে, শ্রদ্ধা, সম্মানে অনেক এগিয়ে যাবেন। চারদিকের মানুষ আপনাকে মনে রাখবে। 

আমার এই লেখারটার প্রধান উদ্দেশ্য- আপনার সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি করা, কীভাবে আমরা আমাদের এই ছোট্ট জীবনটাকে কর্মের মাধ্যমে ইতিবাচক সুদীর্ঘ দান করতে পারি। মৃত্যুর পরও যাতে আমরা মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারি। হ্যাঁ, নিজস্ব কর্মের মাধ্যমে একজন মানুষ তার জীবনকে সুদীর্ঘ দান করতে পারে, অবশ্য সেটা হতে হবে সুকর্ম; যার মাধ্যমে অন্যরা তাকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে তার প্রয়াতের পরও। এ প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সদ্য প্রয়াত গুণীজন আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কথা- যিনি তাঁর গান 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো' এবং আরও অনেক সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে আমাদের মাঝে চিরজীবী হয়ে থাকবেন। 

আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অনেক বড় মাপের মানুষ, আমার এই লেখাটা কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য। আমি এখানে আলোচনা করব একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, আপনি কীভাবে আপনার সুকর্মের মাধ্যমে নিজের জীবনের ইতিবাচক সুদীর্ঘ দান করতে পারেন। বাংলাদেশে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে আর তা হলো 'জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো।' এখানে জন্মস্থানের চেয়ে কর্মকে প্রশংসিত করা হয়েছে। জন্মের ক্ষেত্রে মানুষের নিজের কোনো ভূমিকা থাকে না। উঁচু বংশে জন্মগ্রহণ করেও যদি কেউ অপকর্মে লিপ্ত থাকে, তবে কেউ তাকে শ্রদ্ধা করে না। আবার নীচু কুলে জন্মগ্রহণ করেও কেউ তাঁর কর্ম ও আদর্শের মাধ্যমে চিরজীবী হয়ে থাকতে পারে। 

কোনো কাজ করলে আপনি প্রশংসিত হবেন আর কোনো কাজ করলে আপনি মানুষের মাঝে প্রয়াণের পরও বেঁচে থাকবেন। তার কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বিভাগ নেই, থাকতে পারেও না, কাজ কাজই। তবে হ্যাঁ, কাজটা এমন হতে হবে, তা যেন মানুষের কিছু প্রয়োজনকে স্পর্শ করে প্রয়োজনহীন কাজ কিন্তু কোনোদিন কাজই না। মনে রাখবেন যে প্রতিটা সুকর্মই কিন্তু সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, একটা সমস্যার সমাধান করে, একটা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে, মানুষের মাঝে আশা জাগায়। ধরুন আপনি একজন প্রতিবাদী মানুষ, আপনি সমাজে কোনো অন্যায় কাজ দেখে তার প্রতিবাদ না করে থাকতে পারেন না। মনে রাখবেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা একটা মহৎ গুণ, এই অন্যায়ের প্রতিবাদকারীর পরিচয় মানুষের মধ্যে আপনাকে যুগ যুগ ধরে বেঁচে রাখতে পারে। আপনাকে অনেকে অনুসরণ করতে পারে, এতে সমাজে অন্যায়কারীর সংখ্যাও কমতে পারে। ফিনল্যান্ডের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ফিনিশরা তাদের কাজের প্রতি এতটাই আন্তরিক, ধৈর্যশীল এবং নিয়মানুবর্তী, যা দেখে মনে হয় কর্ম তাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফিনিশ সততা, দায়িত্ববোধ এবং কর্মপ্রীতি প্রশ্নাতীত। হয়তোবা এ জন্যই যে কোনো ফিনিশ দ্রব্য এবং সেবা গুণে এবং মানে খুব উন্নত। 

সব জমিতে যেমন সব ফসল ফলে না, তেমনি সব মানুষের দ্বারাও সব কাজ হয় না। তবে মনে রাখবেন সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে একটা বিশেষ কাজে পাঠিয়েছেন এ ধরণিতে। একটু ভেবেচিন্তে দেখুন, আপনি কোন কাজে ভালো, সে কাজটা করুন, জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাবেন। মানুষও আপনাকে মনে রাখবে, আপনি পরিচিত হতে পারেন সঠিক মানুষ সঠিক কাজটা করছে এমন হিসেবে। 

আমাদের আপসহীন প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ পদ্মা সেতু। এই নশ্বর পৃথিবীতে একদিন হয়তো তিনি বেঁচে থাকবেন না, কিন্তু পদ্মা সেতুর মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আসুন আমরা কর্মে বেঁচে থাকি, প্রদত্ত দায়িত্ব পালনে পিছপা না হই এবং সততায় হই আপসহীন।