সব মানুষের শিক্ষাজীবনের প্রথম বিদ্যাপীঠ হচ্ছে তাঁর পরিবার। আর প্রথম শিক্ষক হলেন তাঁর মা-বাবা। শিক্ষককে পা ছুঁয়ে কদমবুচি করার রেওয়াজটা শিখিয়েছিলেন আমার মা-বাবা। সেটা রাস্তাতেই হোক বা বাড়িতেই হোক। আর এ শিক্ষা শুধু আমার নয়, অনেক পরিবারেই এখনও আছে। মনে পড়ে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাংলা বিষয়ে আমার শিক্ষক কোবাদ হোসেন স্যারের পড়ানো কবি কাদের নেওয়াজের শিক্ষা গুরুর মর্যাদা কবিতাটি আত্মস্থ করতে পেরেছিলাম। এখনও জীবনের মধ্য বয়সে এসে কাদের নেওয়াজের শিক্ষা গুরুর মর্যাদা কবিতাটি পাঠ করতে খুব ইচ্ছা করে। ছেলেমেয়েদের দু-চার পঙ্‌তি পড়েও শোনাই মাঝেমধ্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় মনে হয় অনেক শিক্ষার্থীই সেই কবিতাটি হয় ভালো করে মন দিয়ে পড়েনি বা পড়েও বুঝেনি কিংবা মনে রাখেনি। 

আমার কর্মজীবনে শিক্ষকতার চাকরিতে আমার দু'ধরনের অভিজ্ঞতা কাজ করেছে। প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে গিয়ে মনে হয়েছে, একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞানের দরিয়ায় যা কিছু আছে তা শিক্ষার্থীদের জন্য উজাড় করে দেন। একজন শিক্ষক হিসেবে এখন আমাকে বা আমাদের বিষণ্ণতা বেশ ভর করছে। ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক হত্যা ও শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো, শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো- এসব কিসের আলামত? এসব শিক্ষক হেনেস্তার নানা ঘটনায় তাঁরা মানসিক পীড়ারও শিকার। 

চাকরি নামের কর্তব্য জ্ঞানে হাজারো শিক্ষক দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। বিশেষ করে দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা কোনো দিনও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতো মাসের ৩ বা ৪ তারিখের মধ্যে সরকারি অংশের বেতন-ভাতা পান না। কিন্তু কেন? সরকার তো প্রতি মাসেই বেতন দেন। তাহলে নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতা কেন নয়! শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অভিভাবকের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক সফলতা পেতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আন্তঃসম্পর্ক বাড়ানোর বিকল্প নেই। অভিভাবকদের উচিত শিক্ষকদের সহযোগিতা করা। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। নিয়মিত শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যা দেখে শিক্ষার্থীরা শিখবে। মানতেই হবে, যে শিক্ষায় আনন্দের যোগ নেই সে শিক্ষা ব্যর্থ শিক্ষা। তাই সবার জন্য শিক্ষা হোক আনন্দদায়ক। শিক্ষা আনন্দদায়ক হলেই কেবল এটা সবার প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। কিন্তু শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করার জন্য আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করি না- এটাও যথার্থ নয়।

আমাদের শিক্ষাক্রমেও শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, শিক্ষকদেরও চাপমুক্ত রাখার বিষয়টি। যেমন দেশের প্রাথমিকের শিক্ষকদের টানা পাঁচ থেকে ছয়টি বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করানো। পাশাপাশি শিক্ষকতার অনেক প্রশাসনিক কাজসহ বিবিধ কাজে অংশ নেওয়া। আজ শিক্ষকদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি অনেক জরুরি হয়ে পড়েছে। মূলত শিক্ষকদের প্রতিটি কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি বা উৎসাহ প্রদানমূলক কিছু তেমনটি করেন না। তার পরও নানা ঘটনায় শিক্ষকরা যখন মন বেদনায় রয়েছেন, হচ্ছেন হত্যা, অপদস্থ, লাঞ্ছনার শিকার। তখন তাঁদের বেদনার বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত গুরুত্বসহকারে। তা না দেখলে আগামী দিনে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা থেকে বিমুখ হবেন। তাই আসুন, আমরা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক মিলে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখি। এখানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার থেকে যেমন সন্তানকে শেখাতে হবে শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে। একইভাবে সমাজকেও চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে। কারণ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধের যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরা দৃষ্টান্ত পাবে- এ ধরনের অপরাধে জড়ানোর আগে ভাববে।