আমি প্রায় ৪০ বছর ইউরোপে বসবাস করছি। ভালো-মন্দের ছোঁয়া এখানেও লেগে আছে। তবে অতীতের তুলনায় ধর্ষণ, খুন এবং মাদকাসক্তির সংখ্যা বেশি না বাড়লেও মানসিক অসুস্থতার কারণে ধর্ষণ এবং খুনের সংখ্যা বেড়েছে বললে ভুল হবে না। কিছুদিন আগে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে প্রকাশ্যে গুলি করে যে ব্যক্তি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে; এর কারণ বলা হচ্ছে- মানসিক অসুস্থতা জড়িত। ধর্ষণ করা হচ্ছে। ধরা পড়লে মানসিক অসুস্থতা দেখানো হচ্ছে। ফলে জেলহাজতের পরিবর্তে মানসিক চিকিৎসা চলছে। সুস্থ হয়ে সমাজে এসে একই কাজ করছে। এই হচ্ছে বর্তমান সভ্য জগতের অবস্থা। পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছেই।
এমতাবস্থায় সম্প্রতি সুইডেনের বিরোধী দলের এক নেতা বলেছেন, ধর্ষকদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার আগে কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন করা হোক। ধর্ষককে রাসায়নিক নির্গমন (ক্যাস্ট্রেশন) করে তার যৌনশক্তি নষ্ট করে তাকে সমাজে ছাড়া হোক। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বলা হচ্ছে, কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন করলে যৌন আসক্তি কমলেও মাথার কুচিন্তা দূর হবে কীভাবে? এতে হিতে যে বিপরীত এবং ভয়ংকর কিছু ঘটাবে না- তারই কি নিশ্চয়তা রয়েছে? যখন সেখানে এ আলোচনা চলছে তখন সদ্য এইচএসসি পাস করা এক শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে আমাকে দেশের বর্তমান শিক্ষা, মাদকাসক্তি ও ধর্ষণের তথ্য দিয়ে তার মনের কিছু কথা ব্যক্ত করেছেন।
তিনি কয়েক মাস আগে ফেসবুকে দেখেছিলেন, এক প্রতিবেশী চাচার ছেলে সিগারেট সেবন করছে এবং তার ভিডিও বানিয়ে ফেসবুক-টিকটকে সুন্দর ও মার্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, সে নাকি প্রতিনিয়ত সেবন করে। তার বয়স মাত্র ৬-৭ বছর। ওর কাছে সিগারেট বিক্রি করল কে? আর তার ভিডিও-ই বা কারা তৈরি করছে? এমন ভিডিওর মাধ্যমে অন্যরাও সিগারেট সেবনে উৎসাহ পেতে পারে।
আমাকে যে বার্তা দিয়েছে তার ছোট ভাই এখন বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করছে; এবার এসএসসি দেবে। তাই ওর খোঁজখবর নিতে হয়। ওর সমবয়সীদের ওপরেও নজর রাখতে গিয়ে দেখতে পায়, ওদের দশজনের মধ্যে তিনজন আছে যারা এমন কোনো মাদক নেই, যা তারা সেবন করেনি।
এই যে আমাদের প্রজন্ম অল্প বয়সেই এসব অনৈতিক কার্যকলাপে ঢুকে যাচ্ছে, এদের কী হবে? কে নেবে এদের দায়িত্ব? এদের হাতে মাদক পৌঁছে কীভাবে? এদেরই আবার দেখা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে, যারা বড়দের আদেশে যে কোনো কিছু করতে রাজি। পরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এরাই আবার মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ অন্যান্য অপরাধে জড়ায়। কারণ অপরাধ একটার সঙ্গে আরেকটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন আমরা সবাই দেখছি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সমাজে কী ঘটছে, সেদিকে আমাদের নজর আছে কি? বর্তমান প্রজেন্মের মধ্যে এমন অপরাধপ্রবণতা নিঃসন্দেহে খারাপ ঘটনার বার্তাবহ। এমনটা চলতে থাকলে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। এদের মতো ৮-১০ জন একসঙ্গে কোথাও দাঁড়িয়ে থেকে কাকে কখন উত্ত্যক্ত করবে, সেই ভয়। সেখানে আমাদের মা-বোনরাও তার শিকার হতে পরে। আজকাল খবর বের হয়- বোনকে উত্ত্যক্ত করার সময় বাধা দিতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে যুবক আহত অবস্থায় মেডিকেলে ভর্তি বা তার মৃত্যু। আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? আমাদের শিক্ষা কি যথাযথ হচ্ছে? আত্মোন্নয়ন যদি না ঘটাতে পারে, তবে সেই শিক্ষার মূল্য কী?
যথাযথ শিক্ষা যেমন প্রয়োজন তেমনি বাস্তব কিছু পদক্ষেপও সমানভাবে জরুরি। কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশনও তার বাইরে নয়। যারা শিশু-কিশোর বয়স থেকে অপরাধে জড়িয়ে যায়, তারা ধীরে ধীরে কতটা মরিয়া হয়ে উঠছে, কল্পনাও করা কঠিন। দেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন থেমে নেই। সেদিক থেকে কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশনের চিন্তা বাতুলতা নয়। তবে আমাদের তরুণদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য পরিবারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রহমান মৃধা: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com