হাজার বছর ধরে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে মাছ শব্দটি। তাই প্রবাদেও আছে 'মাছে-ভাতে বাঙালি'। এটি শুধু প্রবাদ নয়; বাঙালির জাতীয় চেতনাও বটে। এ চেতনা ধারণ করেই মাছ চাষি, মৎস্যবিজ্ঞানী ও গবেষক, সম্প্রসারণবিদসহ সংশ্নিষ্ট সবার নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ মৎস্যসম্পদে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের প্রায় সর্বক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হলেও মৎস্য ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েনি। এর ফলস্বরূপ দেখা যায়, কভিড-১৯ এর কারণে বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৪২ দশমিক ৬৭ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ৫ হাজার ১৯১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষিক্ষেত্রে মৎস্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত থাকার ফলে মাছ উৎপাদন নিয়মিত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বপরিমণ্ডলে মাছ উৎপাদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় রেকর্ড তৈরি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশ আজ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে ৩য়; স্বাদু পানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে ২য়; বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে ৫ম; অ্যাকুয়াকালচার অর্থাৎ মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ উৎপাদনে ৫ম; ইলিশ আহরণে বিশ্বে ১ম; সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া এবং ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও দ্বাদশ। 

আর এই সম্ভাবনাময় সম্পদ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে প্রতিবারের মতো এবারও নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হচ্ছে 'জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২২'। 'নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ'- এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ২৩ জুলাই শুরু হয়েছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ। চলবে ২৯ জুলাই পর্যন্ত।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটানো, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সরকারের সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপির ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ১ দশমিক ২৪ শতাংশ মৎস্য খাতের অবদান। এ খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

জনবহুল বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটানো; কলকারখানার বর্জ্য, ফসলি জমিতে কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদীদূষণ; অতিরিক্ত মাছ আহরণসহ নানা কারণে দেশি মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও বহু প্রজাতি হুমকির মুখে। মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩টি ছোট প্রজাতির। এর মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে। সরকারের পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিলুপ্ত প্রজাতির মাছকে আমাদের খাবার প্লেটে ফিরিয়ে আনতে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২১ বছরে ৩১টি দেশি মাছের চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে মৎস্য চাষিদের হাতে তুলে দিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে চলতি বছরেই ১০টি দেশি মাছের জাত বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করে উৎপাদন বাড়ানোর উপায় বের করা হয়েছে। সফলতার ধারাবাহিকতায় ৩১তম মাছ হিসেবে গত বছরের ২৫ আগস্ট যুক্ত হয় কাকিলা। এ মাছটির কৃত্রিম প্রজনন বাংলাদেশেই প্রথম। পাবদা, গুলশা, গুজি আইড়, রাজপুঁটি, চিতল, মেনি, ট্যাংরা, ফলি, বালাচাটা, শিং, মহাশোল, গুতুম, মাগুর, বৈরালি, কুচিয়া, ভাগনা, খলিশা, কালবাউশ, কই, বাটা, গজার, সরপুঁটি, গনিয়া, জাইত পুঁটি, পিয়ালি, বাতাসি, রানী, ঢেলা ও কাকিলা- এই ৩১ প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ট্যাংরা মাছের দুই রকম জাত রয়েছে। প্রায় এক যুগের প্রচেষ্টায় ২০২১ সালের জুন মাসে রুই মাছের নতুন জাত 'সুবর্ণ রুই' উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ছাড়া মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের লাইভ জিন ব্যাংকে দেশের বিলুপ্তপ্রায় ৮৯ প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। গবেষক, চাষি ও উদ্যোক্তারা যেন সহজেই এ মাছগুলো পেতে পারেন, সে কারণেই এ প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাকাজে সাফল্য আসায় গত ১১ বছরে দেশি ছোট মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। ২০০৯ সালে পুকুরে চাষের মাধ্যমে দেশি ছোট মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার ৩৪০ টন, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় তিন লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের দেশে মৎস্য উৎপাদনে দেশি ছোট মাছের অবদান ৩০-৩৫ শতাংশ।

প্রাচীনকাল থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ আমাদের সহজলভ্য পুষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে মলা, ঢেলা, পুঁটি, বাইন, ট্যাংরা, খলিশা, পাবদা, শিং, মাগুর, কেচকি, চান্দা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড, অন্ধত্ব প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

মাছ আমাদের দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ দৈনিক ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে ৪৬ লাখ টন থেকে ৬৫ লাখ টন ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৮৫ লাখ টনে উন্নীত করতে চায়। খাদ্য নিরাপত্তা সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়; ব্যালান্স ডায়েট নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।