শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে বিক্রমাসিংহের রাষ্ট্র শাসন সবচেয়ে উদ্বেগের হতে চলেছে। দেশজুড়ে চলা এই অচলাবস্থা এমনকি গৃহযুদ্ধের সময়ের চেয়েও ভয়াবহ। আন্দোলনকারীরা তাঁর অফিসে আক্রমণ করে, বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পদত্যাগের গুরুতর দাবি করা সত্ত্বেও রনিল বিক্রমাসিংহে একরকম চাতুরীর সঙ্গেই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের সিংহাসন দখল করেন। ২০ জুলাই সংসদীয় নির্বাচনে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির রনিল বিক্রমাসিংহে ১৩৪ ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দুল্লাস আলাহাপেরুমে ৮২ ভোট পেয়েছিলেন এবং অনুরা কুমারা দিসানায়েকে মাত্র তিনটি ভোট পেয়েছিলেন। ২২ মিলিয়নের এই দেশ, তার বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ কমে যাওয়ায় জ্বালানি, খাদ্যের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র অভাবে দিন অতিবাহিত করছে বিগত কয়েক মাস ধরেই। ২০১৯ সালের শেষে দ্বীপ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মার্কিন মুদ্রায় ৭.৬ বিলিয়ন, যা মাত্র ২৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। বর্তমানে রাজ্যের রপ্তানির পরিমাণ তার বিদেশি মুদ্রা ব্যবহার বা আমদানির তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে কম। রাজ্যের আমদানি মূল্য ৩ বিলিয়ন মূল্যের অনুমান করা হয়। রপ্তানির চেয়ে বেশি পরিমাণ আমদানি তার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ।

বিদেশি ঋণদাতাদের কাছে ৫১ বিলিয়নেরও বেশি দেনা আছে শ্রীলঙ্কার। এই পরিমাণের মধ্যে চীনের কাছেই ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। মোট ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ। চীনের এই ঋণের পাশেও আছে অতিরিক্ত লুকানো ট্যাপ।

প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের রাজ্যপাটে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক বোঝা থাকবে। তাঁর কাছে প্রতিবন্ধকতা থাকবে দেশ ও বিদেশ থেকে, যা তিনি সহজেই এড়াতে পারবেন না। দেশজুড়ে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ শান্ত করা তার প্রথম পদক্ষেপ হবে। দ্বীপরাষ্ট্রে দ্রোহ দমন করা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ উপায়ে দেশবাসীর আস্থা অর্জনের পরিবর্তে তাঁর আর কোনো বিকল্প নেই। রনিল বিক্রমাসিংহে রাজাপাকসেদের সরাসরি নির্বাচনে পরাজিত করতে পারেননি। বরং গোটাবায়া রাজাপাকসের পলায়ন তাঁর আসন দখলের পথ প্রশস্ত করেছে।

২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে গোটাবায়া রাজাপাকসের শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতার দুই-তৃতীয়াংশ পেয়েছে এবং বিক্রমাসিংহের উ এন পি মাত্র একটি আসন পেয়ে থাকে। যার আগে সংসদে ১০৫টি আসন ছিল। প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহকে শুধু তাঁর পূর্বসূরি গোটাবায়া রাজাপাকসে নন, রাজাপাকসের আনুগত্য মেনে চলা গোষ্ঠীর থেকেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

যেহেতু দেশটির মুদ্রা দ্রুত হারে অবমূল্যায়ন হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাজনক। ৩৬০ শ্রীলঙ্কান রুপি এখন একটি ডলারের সমান। ২২ মিলিয়নের দেশে লাখ লাখ লোক তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনের তাগিদ মেটাতে অমানবিক সংগ্রাম করে চলেছেন। দিনে তিনবারের পরিবর্তে লঙ্কান নাগরিকরা দিনে দু'বার খাবার খাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রতিদিন মাত্র খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীলঙ্কার সংকট একজোড়া ঘাটতি সমস্যার ফলাফল। একটি অস্থিতিশীল রাজস্ব ঘাটতি এবং সেই সঙ্গে অস্থিতিশীল ক্যারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি দ্বীপ জাতির ভাগ্যের জন্য দায়ী। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা দেশকে এ রকম অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে। গোটাবায়ে রাজাপাকসের কর নীতি ছিল অন্যতম সমস্যা। তিনি মূল্য সংযোজন কর অর্ধেক কমিয়েছিলেন এবং আরও বেশ কিছু পপুলিস্ট নীতি প্রণয়ন করেন, যা রাষ্ট্রকে দেনার দায়ে ডুবিয়ে দেয়।

অর্থনীতির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বিক্রমাসিংহকে আইএমএফ ছাড়াও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পেতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাহায্যও বিশেষ প্রয়োজনীয়। শুধু ২০২২ সালেই ভারতের সহায়তা মার্কিন মুদ্রায় ৩.৮ বিলিয়নের বেশি। ভারত শ্রীলঙ্কায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং পেট্রোল এবং ৪৪,০০০ টন ইউরিয়া পাঠিয়েছে। ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আইএমএফে আলোচনার জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করছে, যদিও এই দ্বীপরাষ্ট্র এর আগে চীনের পক্ষ নিয়ে নয়াদিল্লিকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। তবে ভারত দেশটিতে যথাযথ সাহায্য করলেও স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে ভারতের সেনা মোতায়েন করবে না তার নীতি মেনেই।

২০ জুলাই দ্বীপরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের রাজ্যাভিষেকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা এই দুর্দিন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। আইএমএফ এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহযোগিতা করতে পারে।

একবার আইএমএফ সম্পূর্ণ সমর্থন দিতে শুরু করলেই পশ্চিমা রাজধানীগুলো আর্থিক সহায়তা প্রসারিত করবে বলে আশা করা যায়। পশ্চিমের দেশগুলো মূলত কলম্বোতে একটি স্থিতিশীল সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে।

বিক্রমাসিংহে ছয়বারের প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠান বা আইএমএফে একটি পরিচিত মুখ। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ায় শ্রীলঙ্কার ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা এবং সুফলের সুযোগ রয়েছে।

তবে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে কলম্বো নীতিগত পরিবর্তনের আনতে বাধ্য। চীনের সঙ্গে সমীকরণ তার মধ্যে একটি। প্রেসিডেন্ট বিক্রমাসিংহে তাঁর পূর্বসূরির মতো চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তাই খনিজ তেল সরবরাহের জন্য রাশিয়া এবং কাতারের সঙ্গে আলোচনা চালালেও যুক্তরাষ্ট্রকে চটানো যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় ফলপ্রসূ হবে।

১৯৯১ সালে ভারত এই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট সংকটে ভয়ানকভাবে ভুগছিল। ভারতের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও

তখন ক্ষমতায় ছিলেন, যিনি অর্থনীতির উদারীকরণ করেন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেন। এই নীতিটি ভারতের জিডিপি ২.৫ ট্রিলিয়ন চিহ্ন অতিক্রম করার পথ প্রশস্ত করেছে।

একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শ্রীলঙ্কার সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর ড. নন্দলাল ওয়েরাসিং বলেছেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে শ্রীলঙ্কা পাঁচ মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে। দেশব্যাপী ক্ষোভ সত্ত্বেও লঙ্কান প্রভাবশালীদের একটি অংশ বিক্রমাসিংহের ওপর আস্থা রাখে। এই অর্থনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট বিক্রমাসিংহের কাছে এখনও সুযোগ রয়েছে অর্থনীতিবিদ এবং আইএমএফের পরামর্শ অবলম্বনের। রাতারাতি নীতি ও অর্থনীতি সংস্কার করা খুব সহজ নয়, তবে শ্রীলঙ্কাকে এই আঁধার থেকে বেরিয়ে আলো দেখাতে পারে আইএমএফ এবং অর্থনীতিবিদরা। সুচিন্তিত রাজনীতি অর্থনীতির চাকা ঘোরাতেই পারে বলেই আশা রাখা যায়।