শুক্রবার চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ট্রেন ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ১১ জনের প্রাণহানি হলো। এখনও বেশ কয়েকজন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কারও কারও হাত-পা ভেঙে গেছে; মাথায় একাধিক সেলাই লেগেছে। একসঙ্গে ছয় শিক্ষার্থী ও চার শিক্ষকের মৃত্যুতে শোকে কাতর স্বজন হারানো পরিবার। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। রাজনীতিবিদরাও শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিচ্ছেন। ৭০ এর দশকে সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘শুধু শোকসভা তারই নাম আজ বাংলাদেশ/ বাংলা তোমার শোকের নেইকো শেষ।’ শোক প্রকাশ আর শোকসভা করার চেয়ে জরুরি এ ধরনের দুর্ঘটনার নামে ‘হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ করা।

এটিকে নিছক দুর্ঘটনা না বলে হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়। কারণ, একাধিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে, দুর্ঘটনার সময় কর্তব্যরত গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন না, তিনি জুমার নামাজে গিয়েছিলেন। ঘটনার পরপর এ সত্যটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে গেলেও পরে সেই গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। তাঁকে বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রিমান্ড হবে, শুনানি হবে, হয়তো সাজাও হবে। ইদানীং আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে কিংবা গ্রেপ্তার হলে দল থেকে বহিস্কারের রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। আগে আর খবর থাকে না। রেলওয়ের এ রকম আরও গেটম্যান আছেন, যাঁরা দায়িত্বে গাফিলতি করছেন। তাঁদের বহিস্কার কি ওই ক্রসিংয়ে প্রাণহানির পর হবে? একজন কর্মচারীকে বহিস্কার করেই কি এই দায়িত্বহীনতার পাপ মোচন হবে? দায় কি শুধু গেটম্যানের? তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না। প্রতিবছর রেলওয়ের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ হয়, তার পরও কেন সব ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। নিয়োগ দিলেও অপ্রশিক্ষিত গেটম্যান কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের পর কণ্ঠশিল্পী হায়দার হোসেনের কণ্ঠে একটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- ‘যার চলে যায় সে বুঝে হায় বিচ্ছেদের কী যন্ত্রণা।’ চট্টগ্রামে ১১ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে অনেকেই গানটি শেয়ার করছেন। চলন্ত বাস অন্য যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে পড়ে গিয়ে প্রাণহানি হলে সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু রেলক্রসিংয়ে এভাবে মৃত্যুকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বলা যাবে না।

সূত্রমতে, দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং অরক্ষিত। বাকি ১৮ শতাংশে গেটম্যান থাকলেও তাঁদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। অবহেলার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ চট্টগ্রামে পাওয়া গেল। গেটম্যানের গাফিলতির বলি হতে হলো ঝর্ণা দেখে বাড়ি ফেরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। জানি, এসব পরিবারকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা যে সারা জীবনের কান্না। এই কান্না স্বজন হারানো পরিবারকে যুগ যুগ বয়ে বেড়াতে হবে। দুর্ঘটনায় যাঁরা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের জীবনে এই কান্নার ভয়াবহতা আরও বেশি। চট্টগ্রামে দুর্ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে বিভিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশ ও সম্প্রচার করা হচ্ছে। টেলিভিশনের টকশো ও সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতায় নানা ধরনের বিশ্নেষণ প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু দু'দিন পরই যখন নতুন ইস্যু সামনে আসবে, তখন এটি চাপা পড়ে যাবে।

এই যে দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং অরক্ষিত তা শতভাগ সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত সংবাদ ও লেখালেখি অব্যাহত থাকুক। সরকারের এত সাফল্য, সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে নদীর তলদেশ দিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার সংযোগ টেনে দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। অথচ নিরাপদ ভ্রমণের পরিবহন হিসেবে খ্যাত রেলের ৮২ শতাংশ ক্রসিং অরক্ষিত। একজন মহিউদ্দিন রনি রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ৬ দফা দাবিতে আন্দোলন করেছেন। তাঁর দাবির মধ্যে অরক্ষিত ক্রসিংয়ের বিষয়টি চোখে পড়েনি। চট্টগ্রামে দুর্ঘটনার পর এটি আমাদের সামনে এসেছে। হয়তো এমন আরও অনেক অজানা ত্রুটি রয়ে গেছে। অবস্থা এমন- সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা। এবার সরকারের উচিত অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা। যাতে আর এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে না হয়। পাশাপাশি ট্রেন আসার সংকেত পাওয়ার পরও কিংবা ক্রসিংয়ে বার ফেলার মুহূর্তে দ্রুত পার হওয়ার নেশায় গাড়ি চালানো বা পথচারীদের ক্রসিং পারাপারের অশুভ মানসিকতা বন্ধ করতে হবে। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলেও আমরা সচেতন না হলে সিগন্যাল অমান্য করার মানসিকতা পরিহার করতে না পারলে সুফল আসবে না।