যুক্তরাষ্ট্র্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তারা সংশ্নিষ্ট দেশের, বিশেষ করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও সমস্যার চিত্র তুলে ধরে। এটা তারা করে প্রধানত নিজ দেশের বিনিয়োগকারীদের সংশ্নিষ্ট দেশ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য। মার্কিন ওই প্রতিবেদন এবারও প্রকাশিত হয়েছে এবং রোববার আমাদের জাতীয় এক বাংলা দৈনিক এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি।

এ পর্যন্ত পড়েই কেউ কেউ বলতে পারেন, দুর্নীতি! এ তো পুরোনো বিষয়। এ নিয়ে নতুন করে লেখার কী আছে?

হ্যাঁ, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্নীতি বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দুর্নীতিবিরেধী সংস্থা টিআইবি প্রতি বছর অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেরও দুর্নীতি পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব নিয়ে দেশে যত আলোচনা-সমালোচনা হয় তার পর দুর্নীতি নিয়ে আর কিছু বলতে গেলে তা চর্বিতচর্বন হয়ে যেতে পারে, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মার্কিন ওই প্রতিবেদন দেখে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে হলো দুটি কারণে। একটা হলো দেশে নানা খাতে যে ব্যাপক ডিজিটাইজেশন হচ্ছে তার অন্যতম লক্ষ্য বলা হচ্ছে দুর্নীতি বন্ধ করা; কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে এ বিষয়ে নিজের একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলা; আরেকটা হলো, বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে ভালো করার অনেক প্রয়াসের ফল কেন এখনও মিলছে না তা বোঝার চেষ্টা করা।

যে খাতে সরকারের ডিজিটাইজেশন কর্মসূচি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তা হলো ভূমি। বিশেষ করে জমির পর্চা বা খতিয়ান ও নামজারি নিয়ে গ্রামের মানুষ তো বটেই, শহরের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষদেরও যে পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা সবার জানা। এসব কাজে সরকারি ফি নামমাত্র হলেও অনেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও জমির কাগজপত্র ঠিক সময়ে পান না। ভূমি অফিসে- বিশেষ করে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতির জাল এতটাই ছড়ানো যে, সহকারী তহশিলদার ও তহশিলদার, যারা কিনা জাতীয় বেতন স্কেলে যথাক্রমে ১৬ ও ১৭ গ্রেডের কর্মী এবং যাদের মাসিক বেতন সাকল্যে ১৫-১৬ হাজার টাকার বেশি নয়, তাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে খুব বেশি সময় লাগে না। এমনও দেখা গেছে, উপজেলা পর্যাযের একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কয়েক বছর চাকরি করে কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। বলা হয়েছিল, ভূমি অফিসের এসব কাজ ডিজিটাইজ করা হলে অর্থাৎ অনলাইনে সম্পাদনের সুযোগ তৈরি হলে দুর্নীতির এ বিষচক্র ভেঙে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খতিয়ান ও নামজারির কাজ এখন বাধ্যতামূলকভাবে পুরো অনলাইনে করতে হলেও ঘুষের টাকা সেবাগ্রহীতাকে ঠিকই গুনতে হচ্ছে।

মে মাসের ১৭ তারিখ আমার একটা জমির নামজারির জন্য সংশ্নিষ্ট ইউনিয়ন অফিসে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমেই তারা প্রয়োজনীয় কাগজসহ ৩০০ টাকা ফি নেয় তথাকথিত সার্ভিস চার্জ হিসেবে। সরকারি ঘোষণায় এসব কাগজ আপলোডের কাজ যে কোনো জায়গা থেকে যে কেউ করতে পারবে বলা হলেও, আমাকে বলা হয়, ওই ৩০০ টাকার বিনিময়ে তাদের লোক দিয়ে আপলোডের কাজ না করা হলে দুর্ভোগে পড়তে হবে। একবার আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন আরজেএসসিতে একটা ফাউন্ডেশন নিবন্ধন করতে গিয়ে নেম ক্লিয়ারেন্সের টাকা জমা দেওয়ার পর অনলাইনে আর কোনো তথ্য আপলোড করতে পারিনি অব্যাহত বাফারিংয়ের জন্য। শেষমেশ সেখানকার এক কর্মকর্তার পরামর্শে তারই দেখিয়ে দেওয়া দালাল দিয়ে আমাকে কাজটা সমাধা করতে হয়। ওই বিরক্তিকর ও রহস্যজনক বাফারিংয়ের কথা ভেবে আমি ওই ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের প্রস্তাবে দ্রুত রাজি হয়ে যাই।

ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে ঘটনাচক্রে আমার পরিচয় ঘটে। তাঁর সহায়তায় আমি পরবর্তী কাজগুলোর জন্য তারই ব্যাচমেট আমার কাজ যেখানে সখানকার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বেশ ভালোই সাড়া দেন আমার আবেদনে। গত কোরবানি ঈদের আগে আগে তিনি আমাকে বলেন, আপনার কাজ হয়ে গেছে; ডিসিআর কেটে নির্ধারিত ফি জমা দিলে বাকিটুকু খুব অল্প সময়ে সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু আমি যখন ডিসিআর কাটতে যাই তখন বলা হয় এ জন্য একটা এসএমএস আমার ফোনে আসার কথা; সেটা দেখাতে হবে। আমি যেহেতু তেমন কিছু পাইনি তাই তখন ডিসিআর কাটা যায়নি। ঈদের পর আমি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বিষয়টি জানাই। তখন তিনি খোঁজ নিয়ে বলেন, সংশ্নিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা এটাকে সিস্টেমে দেননি; তাই এসএমএস আসেনি। কেন দেননি এটা ব্যাখ্যা করে বলার নিশ্চয় প্রয়োজন নেই। আকলমান্দ কে ইশারাই কাফি। যাক, ওই কমিশনার এজন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং রোববার কাঙ্ক্ষিত এসএমএসটি আমি পাই।

ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় নামজারি করতে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদান্যতায় বড় কোনো ঘুষ না দিতে হলেও আমার অভিজ্ঞতাটা কিন্তু সুখকর নয়। তাই ভাবছি, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ডিজিটাইজেশন হলেও শুধু ভূমি নয়, অন্য খাতগুলোতেও কতটুকু দুর্নীতি কমেছে? এখানে আমার এক বন্ধুর আরেকটা অভিজ্ঞতার কথা বললে নিশ্চয় বাহুল্য হবে না। বন্ধুটি গত বছর শুরুর দিকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলতে গেলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন উদ্ভিদ সংঘনিরোধ উইং থেকে ছাড়পত্র আনতে হয়। কাজটি এখন অনলাইনে করা লাগে; কিন্তু কাগজপত্র আপলোড করতে হয় সংশ্নিষ্ট অফিসের দেখিয়ে দেওয়া লোকদের দ্বারা, না হয় ওই বাফারিং হতে থাকবে অনন্তকাল। শুধু তাই নয়, ছাড়পত্রে যিনি স্বাক্ষর করবেন তাকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ওই আপলোডকারীর মাধ্যমে দিতে হয়, না হলে যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা তা সপ্তাহ নিলেও বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ থাকবে না।

এ তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো বলার কারণ হলো, এগুলোর সঙ্গে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সরকারি লোকজন দাবি করছে, ডিজিটাইজেশনের কারণে দেশের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি অনেক কমে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। এ কারণেই বিশ্বব্যাংকের ডুয়িইং বিজনেস সূচকে উন্নতির আশায় ব্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে ব্যবসায়সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন খাতে সংস্কারের চেষ্টা হলেও বাংলাদেশের বিশেষ করে বৈদেশিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী হয়তো শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি পাবেন। কিন্তু সে জমি তার বা কোম্পানির নামে করতে গিয়ে ভূমি অফিসে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাকে হতে হবে তাই যথেষ্ট ওই বিনিয়োগকারীর উৎসাহে পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য। তা ছাড়া এ কাজে আরও যত সরকারি বিভাগ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়, যতই বলা হোক, সেসব ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সুলভ করা হবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন তার জন্য কত মণ তেল তাকে ঢালতে হবে।

মার্কিন ওই প্রতিবেদন বিষয়টি সামনে নিয়ে এলেও তা এখানে বসবাসকারী কারোই অজানা নয়। তাই সমস্যার সমাধানটাই কাম্য, মার্কিন ওই প্রতিবেদন গ্রহণ বা বর্জন নয়।