শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। মায়ের দুধ শিশুদের পরিপূর্ণ ও সর্বোৎকৃষ্ট খাবার। জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। মাতৃদুগ্ধ পানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উৎসাহ প্রদান ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে 'বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ' পালন করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশ এই সপ্তাহটি পালন করছে। বাংলাদেশেও ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর জাতীয়ভাবে বিশেষ এই সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন কর্তৃক এই বছরের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, 'স্টেপ আপ ফর ব্রেস্টফিডিং :এডুকেট অ্যান্ড সাপোর্ট' অর্থাৎ মাতৃদুগ্ধ পানের জন্য শিক্ষা ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

মায়ের দুধকে শিশুর প্রথম টিকা বলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ালে নবজাতকের মৃত্যুহার প্রায় ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অন্যদিকে মায়ের দুধের পরিবর্তে যদি তাদের গুঁড়া দুধ বা বাজার থেকে কিনে আনা শিশুখাদ্য খাওয়ানো হয়, তাহলে নিউমোনিয়া, ডায়ারিয়া, জন্ডিস, কানপাকা, অ্যালার্জি, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর সঠিক শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি গুণাগুণ কেবল মায়ের দুধেই সঠিক পরিমাণে পাওয়া যায়।

শিশুর অপুষ্টি রোধে মাতৃদুগ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বৈষম্য দূর করে। তবে বর্তমানে অনেক মায়েরাই আছেন যাঁরা শিশুকে মাতৃদুগ্ধদানে অনীহা প্রকাশ করেন, যা মোটেই উচিত নয়। তাই বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার ও সমাজের সবাইকে দৃঢ়ভাবে পুনর্গঠিত হয়ে সঠিক জ্ঞান ও আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধদানে উৎসাহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কর্মক্ষেত্রসহ সমাজে সর্বোপরি এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এক কথায়, সমাজকে মাদৃদুগ্ধদানবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

কভিড মহামারির ফলে বিগত আড়াই বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মাতৃদুগ্ধদানের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে, যা সঠিকভাবে পুনর্গঠন করা আবশ্যক। গ্লোবাল নিউট্রিশন টার্গেট ২০২৫ অর্জনের লক্ষ্যে সবাইকে সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং এ-বিষয়ক প্রচার-প্রচারণাও বাড়ানোর মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষকে সচেতন করতে হবে। একজন গর্ভবতী বিশেষ করে কর্মজীবী মায়ের জন্য গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী দুগ্ধদানের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক, যা প্রস্তুতি গর্ভধারণের শুরু থেকেই নিতে হবে। মা ও নবজাতকের সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সুস্থতা ও স্তন্যদানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি নবজাতকের ওজন কম হয় বা কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর ভূমিকা অনেক। পাশাপাশি কর্মজীবী মায়েদের জন্য পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করে তাঁদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও বাড়তি পুষ্টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সফল মাতৃদুগ্ধদান নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) দীর্ঘদিন যাবৎ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৫% হলেও বাংলাদেশে তা ৬০% এরও বেশি। তবে সবার সচেতনতা ও সম্মিলিত সহযোগিতায় এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ ছাড়া মাতৃদুগ্ধ-বিকল্প খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জাম আইন, ইন্টারন্যাশনাল কোড অব মার্কেটিংয়ের প্রয়োগ আরও কঠোর করা দরকার।

মাতৃদুগ্ধদান মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই উপকারী। এর মাধ্যমে মা ও শিশুর মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়। তাই বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহকে সফলভাবে পালন এবং এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করি।