বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার এক সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বেঁচে থাকলে এ বছর তাঁর বয়স হতো ৯৩ বছর। তাঁর ডাকনাম ছিল রেণু। শৈশবেই পিতৃমাতৃহীন রেণুর সঙ্গে মাত্র তিন বছর বয়সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয়। শেখ মুজিবের পরিবারের সঙ্গেই বেড়ে ওঠেন তিনি। তখন তিনি শেখ মুজিবের পিতামাতার কাছে কন্যার মতোই আদর-যত্ন পান। সংসার শুরু হয় জাতির পিতার এন্ট্রান্স পাসের পর, মাত্র দশ বছর বয়সে। শেখ মুজিবের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হয়, তখন শেখ মুজিবও ছিলেন বাবা-মায়ের কাছে আদরের খোকা। তখনও তিনি শেখ মুজিব হয়ে ওঠেননি।

পরবর্তী সময়ে খোকা থেকে শেখ মুজিব, কর্মীদের প্রিয় মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতা হয়ে ওঠার প্রতিটি পর্বে পাশে থেকে কখনও নেপথ্যে, কখনও প্রকাশ্যে তাঁকে সাহস দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। জাতির পিতার জীবনের বহু সংকটে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংসার সামলেছেন।

সংসারের পাশাপাশি তিনি জাতির পিতার পক্ষে দেশের মানুষের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন জাতির পিতার যোগ্য সহধর্মিণী। তাঁর সহিষুষ্ণতার কথা জাতির পিতা আমৃত্যু মনে রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ রাজধানীর আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি নারীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে বলেন-'আমার জীবনেও দেখেছি যে, গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনোদিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবার আমার জীবনের ১০-১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনোদিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে, আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তাঁর দান যথেষ্ট রয়েছে। পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না।'

স্বামী জেলে গেলে এবং সংসার খরচের টাকাপয়সা না থাকলে স্ত্রীরা যে স্বামীকে রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করবেন এবং উপার্জনমুখী হতে বলবেন- স্বাভাবিক নারীদের জন্য এটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব তা করেননি। তিনি যে ভবিষ্যতে বঙ্গমাতা হয়ে উঠবেন। সেই দেশমাতার বীজ তাঁর মধ্যে ছিল। তাইতো স্বামী জেলে গেলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারতেন- 'জেলে থাকো, আপত্তি নেই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখো। তোমাকে দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। তোমার কিছু হলে বাঁচব কী করে?'

এ কথাতেই বোঝা যায় যে স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসারও যেমন কমতি ছিল না, তেমনি রাজনীতিতেও তাঁর আপত্তি ছিল না। একই রকম ভালোবাসা জাতির পিতারও ছিল বঙ্গমাতার প্রতি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বা কারাগারের রোজনামচাতে তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন সে কথা। জেলখানায় থাকাকালীন তাঁর মাধ্যমেই বেশির ভাগ সময় জাতির পিতা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারেন, এটা জানার পরও বঙ্গমাতা সেই দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করতেন। শেখ হাসিনার লেখায় আমরা দেখি- 'জেলখানায় দেখা করতে গেলে আব্বা তাঁর মাধ্যমেই দলীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর পেতেন। আব্বার দিকনির্দেশনা আম্মা নেতাকর্মীদের পৌঁছে দিতেন। আব্বা কারাবন্দি থাকাকালে সংসারের পাশাপাশি সংগঠন চালানোর অর্থও আমার মা জোগাড় করতেন। তিনি কখনও ব্যক্তিগত, পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে তাকাননি। একদিকে যেমন সংসারের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনাসহ প্রতিটি কাজে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।'

বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপিও তাঁর এক স্মৃতিচারণে একই রকম বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন যে বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাকালে আওয়ামী লীগ অফিসের ভাড়া বাকি পড়ে যাওয়ায় বাড়িওয়ালা এ বিষয়ে তাঁদের বারবার তাগিদ দিলে তাঁরা (প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ) কয়েক ঘণ্টার সময় প্রার্থনা করে দ্রুত মোটরসাইকেলে গিয়ে বঙ্গমাতার শরণাপন্ন হন ও সমস্যার কথা খুলে বলেন। তখন বঙ্গমাতা তাঁদের ভাড়ার টাকা দিয়ে দেন। এ রকম রাজনৈতিক সহযোগিতা ছাড়াও রাজনৈতিক বিচক্ষণতাও ছিল তাঁর প্রখর।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা প্রকাশ ও প্রচারের সময় জাতির পিতাকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তখন ছয় দফার দাবি আদায়ের লড়াইয়ে গোপনে প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তিনি। তিনি বাসা থেকে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে বোরখা ও স্যান্ডেল পরে জনসংযোগে বেরিয়ে পড়তেন। ৭ জুনের হরতাল তাঁর প্রচেষ্টাতেই সফল হয়েছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে আটকের ছয় মাস পর পাকিস্তান সরকার তাঁকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দিলে বঙ্গমাতা দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যানের জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন। তিনি কঠিন স্বরেই বলেন, 'প্যারোলে মুক্তি নিলে মামলার অুার ৩৩ জন আসামির কী হবে?' বঙ্গবন্ধুর প্যারোলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং পাকিস্তান সরকার তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। (৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গমাতার অবদান সব সময় বাঙালি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে)।

৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্ব রাত্রে বঙ্গবন্ধু যখন অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন তখন বঙ্গমাতা তাঁকে বলেছিলেন- 'তোমার যা মনে আসে তাই তুমি বলবে। তুমি রাজনীতি করেছ। কষ্ট সহ্য করেছ, তুমি জুানো কী বলতে হবে। কারও কথা শোনার দরকার নাই।'- এই অনুপ্রেরণার ফসল ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ- ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক মহাকাব্য।

তিনি আমৃত্যু জাতির পিতার পাশে ছিলেন। যখন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল তখন তিনি একবারও বাঁচার জন্য দয়া ভিক্ষে করেননি। বরং দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন- 'ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ, আমাকেও মেরে ফেল।' এরপর ডেডস্টপ। দশ বছরের শিশু সন্তান, জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র-পুত্রবধূ, আত্মীয়স্বজনসহ পুরো একটা পরিবারকে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালাল ঘাতকের দল। সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হলো তাঁর মহাপ্রয়াণ।

২০২১ সালের ৮ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে সরকার এই দিনে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া, সমাজসেবা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, গবেষণা, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাঁচজন বাংলাদেশি নারীকে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক প্রবর্তন করেছে এবং দিবসটিকে 'ক' শ্রেণির দিবস হিসেবে পালন করছে। এটি একটি মহান উদ্যোগ। মাতৃঋণ কখনও শোধ করা যায় না। তবে এ উদ্যোগের ফলে সুযোগ হয়েছে এই মহীয়সী নারীর ভূমিকা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।