জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সমাবেশে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন যাদের নীতি, তাদের কাছ থেকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত হতে পারে না। ২০ প্রতিবাদকারী আহত হয়ে চিকিৎসাধীন।

শাহবাগে যাঁরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন, তাঁরা নিজেদের স্বার্থে রাস্তায় নামেননি। জনস্বার্থে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানাতে মিছিল-সমাবেশ করেছেন। তাঁরা কেন লাঠিপেটার শিকার হলেন? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনস্বার্থে যে কোনো বিষয়ে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, মিছিল করার অধিকার সব নাগরিকের রয়েছে। এ অধিকার সংবিধান দিয়েছে। 

ঘটনার রাতে লাঠিপেটার কথা স্বীকার করেনি পুলিশ। ৮ আগস্ট সমকালে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ উপকমিশনার (এডিসি) হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে লাঠিপেটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিবাদকারীদের। তবে এই বিষয়টি তাঁর 'নলেজে নেই' বলে সমকালকে জানিয়েছেন এডিসি হারুন। যাঁর বিরুদ্ধে লাঠিপেটায় নেতৃত্বের অভিযোগ, তিনি জানেন না বললেও সংবাদমাধ্যমে ঠিকই সেই পেটানোর ছবি এসেছে। 

৮ আগস্ট সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের কয়েকজন সদস্য প্রতিবাদকারীদের লাঠিপেটা করছেন। রোববার রাতে লাঠিপেটার কথা স্বীকার না করলেও সোমবার পুলিশ বাদী হয়ে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এ মামলা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতদের নামে। 

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনসাধারণ কষ্টে আছে- এ সত্যটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের কারও কারও বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়েছে। তবে তাঁরা এটাকে সাময়িক কষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। ঢাকা মহানগরীতে মেট্রোরেলের কাজ চলার কারণে যানজট বাড়ায় এটিকে উন্নয়নের প্রসব বেদনা বলে আখ্যায়িত করে সাময়িক কষ্ট মেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন একজন মন্ত্রী। 

আমরা তো জানি, অন্যায়কারী-অপরাধীদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়। কিন্তু রোববার সন্ধ্যায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে বাম সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলকারীরা শাহবাগ ও কাঁটাবন মোড় ঘুরে আবার শাহবাগে সমাবেশ করেন। এখানে হঠাৎ কেন হামলা হলো? সাধারণ মানুষের কষ্টের প্রতিবাদ জানানো কি অন্যায়?

অতীতেও আমরা এ ধরনের লাঠিপেটা দেখেছি; তবে তখন পুলিশ সংবাদমাধ্যমের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করে অ্যাকশনে যাওয়ার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করত। কিন্তু রোববার নতুন এক অভিজ্ঞতা পেলাম। পুলিশ 'নলেজে নেই' বলে বিষয়টি স্বীকারই করেনি। 

প্রতিবাদ জানানোর ভাষাকে রুদ্ধ করলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়। বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্র নয়। এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে নানা মতের মানুষ বসবাস করে। যে কোনো নাগরিক সংক্ষুব্ধ হলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতেই পারেন। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে শুনানি ছাড়া নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন কি ওই সব বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধেও অ্যাকশনে যেতে হবে?

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে- 'ভাত দেবার মুরোদ নাই, কিল দেবার গোঁসাই'। এসব অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনের খেলা বন্ধ করে জনস্বার্থে জ্বালানি তেলের দাম ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসাই হবে উত্তম সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দিলে জনসাধারণ হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। 

যেসব পুলিশ সদস্য প্রতিবাদকারীদের ওপর লাঠিপেটা করেছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে পুলিশ বিভাগের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যদি প্রকৃতপক্ষে প্রতিবাদকারীরা পুলিশের কাজে বাধা দিয়ে থাকেন তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেই পারেন। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ ছাড়া লাঠিপেটার পর মামলা দিয়ে কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা কেন?