বাংলাদেশের চলমান বিভিন্ন ঘটনা বিশ্নেষণ করলে আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ স্পষ্ট, বাংলাদেশের নিয়মকানুন না মানার প্রবণতা অনেকের মাঝে বিদ্যমান। সুনাগরিক হিসেবে আমাদের সবাইকে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকানুন মেনে চলা উচিত। কিন্তু আইন-আদালত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকা সত্ত্বেও আইনের শাসন মানার সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। যে কারণে বাংলাদেশে ক্রমেই সামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাচ্ছে, জনসাধারণের মাঝে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। তবে বিশেষ করে যাঁরা কোনো বিশেষ পদে আসীন থাকেন কিংবা ক্ষমতার আসনে বসেন, তাঁরা এমনকি তাঁদের নাম ভাঙিয়ে তাঁদের নিকটবর্তী ব্যক্তিদের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা অনেক বেশি। এমন অবস্থার কারণে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্নিষ্ট বাহিনীগুলোকে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। দেশ ও জাতির উন্নয়নের স্বার্থে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং আইনকানুন মেনে চলা।

পৃথিবীতে যে কোনো রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বা নিয়মকানুন জনগণ কতটুকু অনুসরণ করেন, তা ওই দেশের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। আমাদের দেশে বিশেষত ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সড়কপথে চলাচলের জন্য যেসব আইনকানুন আছে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সেগুলো যথাযথভাবে মানেন না। সাধারণ জনগণও সিগন্যাল মেনে রাস্তায় চলাচল করেন না, ওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তার ব্যারিকেড পার হওয়া, ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষেধ হলেও অবাধে চালানো ইত্যাদি এখন সাধারণ বিষয়ে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। সড়কে প্রতিদিনের মৃত্যুর মিছিল এখন নিতান্তই একটা মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা যদি বলতে যাই তাহলে আর বলে শেষ করা যাবে না। গার্মেন্ট শিল্প থেকে রপ্তানি আয় আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাদ দিলে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি ভয়াবহ অবস্থায় বিরাজমান। বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি আর ঋণখেলাপি ক্রমেই বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন ঘটছে। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন। সমাজবিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ যখন কোনো স্তর থেকে অন্য স্তরে অগ্রবর্তী হয়, তখন সমাজে সব নিয়মকানুন একই তালে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন বিষয়। এমন অবস্থায় যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকেন, তাঁদের রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতের দিকে অনেক সতর্কদৃষ্টি রেখে চলতে হয়। যেখানে যেখানে আইনকানুন বা বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটে বা নতুন বিধিবিধান জরুরি হয়ে পড়ে, সেগুলো প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়মতো প্রবর্তন করার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলতে থাকে। দ্রুত বিকাশমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সবার আগে ঢেলে সাজাতে হয় শিক্ষাব্যবস্থাকে। কেননা উন্নয়ন ও পরিবর্তনের জন্য দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও সৃজনশীল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী একান্তই প্রয়োজন।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, আমাদের পরিমাণগত দিকে উন্নয়ন ঘটলেও গুণগত দিকে তেমন একটা উন্নয়ন ঘটেনি। লাখ লাখ এ প্লাসের জোয়ার আর হাজার হাজার মাস্টার্স ডিগ্রিধারী আমাদের দেশে এখন বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণমাধ্যমে উঠে আসছে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, মজুতদারি, সিন্ডিকেট করার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের খবর। যাঁরা এসব করে যাচ্ছেন, তাঁরা যে কত মাত্রার বেপরোয়া হয়ে কাজগুলো করে যাচ্ছেন, সেটি তাঁদের অপকর্মের ধরন-ধারণ দেখেও বোঝা যাচ্ছে। সমাজে অর্থবিত্তের প্রতি লোভ অনেকটা বেড়ে গেছে আর তাতে করে কেউই নিয়মকানুনের ধার ধারছেন না। সমাজের কিছু কিছু মানুষ এতই অর্থের কাঙাল হয়ে উঠেছেন, যেখানেই লুটপাটের সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানেই লুটপাট করে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আফজালের মতো এমন হাজারো আফজালে দেশ এখন সয়লাব। এমন পরিস্থিতিতে সততা, মেধা, নিষ্ঠার চর্চা করে কেউ যদি এই সমাজে চলতে চায়, বর্তমান বাংলাদেশে তাঁর বেঁচে থাকা খুব সহজ হবে না।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি দক্ষ, যোগ্য ও মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। সবাই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির পেছনে সময় ব্যয় করে যাচ্ছে, তাতে করে শিক্ষা ও গবেষণায় রাষ্ট্র অনেক অনেক পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে মোটেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে ভূমিকা মেটাতে পারছে না। উন্নয়ন ও পরিবর্তনের জন্য মেধাবী, যোগ্য, দক্ষ ও সৃজনশীল জনগোষ্ঠী একান্তই জরুরি। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সুযোগ না থাকায় মেধাবী ও দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী গড়ে উঠছে না। 

তারপরও এই অসংগতি আর নেতিবাচক দিকগুলোকে দূরে সরানোর হাতিয়ার হলো শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষাই পারে আমাদের আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও বাঞ্ছিত পরিবর্তন ঘটাতে, আমাদের জ্ঞান ও মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে। আইন অমান্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এলে সমাজে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। আইনের শাসন বাস্তবায়নে আইনের মৌলিক বিষয়গুলো পাঠপুস্তকে সংযোজন করা অনেক জরুরি। এতে করে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইনকানুন বিষয়ে অধিক সচতেনতা গড়ে উঠবে।