বর্তমান সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে দেশে একশ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের রিজার্ভেই টান পড়েছে। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত প্রায় সব দেশের অর্থনীতি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি বিশ্নেষকরা বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়ের বিপুল বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের ধীরগতিকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

বৈশ্বিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় ৭ থেকে ৮ বিলিয়িন ডলারে উঠেছিল। অবশ্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আমদানি ব্যয় কমতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। যেমন জুন মাসে আমদানিকারকরা এলসি করেছিলেন ৭৯৬ কোটি ডলারের; জুলাই মাসে করেছেন ৫৪৭ কোটি ডলারের এলসি। এই মাত্রা আগামী মাসগুলোতে আরও কমতে পারে। রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং করাসহ সাশ্রয়ী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে জ্বালানি আমদানির খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আশার কথা হচ্ছে, বৈশ্বিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা থেমে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্সপ্রবাহও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার এখন যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পও গ্রহণ করছে বহু হিসাব করে। সব মিলিয়ে বিরুদ্ধচারীরা যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, অবস্থা আসলে তেমনটা নয়। এখন যে রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে পাঁচ-ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। অর্থনীতি বিশ্নেষকদের মতে, একটি দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকলে সেটিকেই ইতিবাচক বলা যায়। বাংলাদেশের সেখানে দ্বিগুণ থাকার পরেও কেন আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে? 

বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন পর্যন্ত যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে শক্তিশালী রিজার্ভ যে কোনো সময় দুর্বল হয়ে পড়বে না- এই নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সরকার এরই মধ্যে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, আশা করা যায়, অল্প কিছুদিনের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যাবে। তবে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা সাময়িক। দেশের সার্বিক কল্যাণে দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ আবশ্যক। প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী বিদেশ থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠান। একটু সুনজর দিলে বহুল অবহেলা আর অনাদরের প্রবাসী আয় আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। দেশের সংশ্নিষ্ট অফিস, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীবান্ধব পরিবেশ নেই- এটি বারবার উঠে আসে বিভিন্ন মাধ্যমে। এই জায়গায় গুরুত্বসহকারে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা আমদানি-রপ্তানিতে ব্যাপক ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে এই ঘাটতি ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। নতুন বছরে বাণিজ্য ঘাটতি ঠেকতে পারে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে। এই ঘাটতি নিরসনে ব্যাপক পদক্ষেপ আবশ্যক। শুধু গার্মেন্ট পণ্যের ওপর আমাদের ৮৫ শতাংশ রপ্তানি নির্ভরতা। অন্যান্য খাত মাত্র ১৫ শতাংশ রপ্তানিতে প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যান্য খাতও যদি সমান প্রতিনিধিত্ব করতে পারত, তাহলে এই বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি দেশের অর্থনীতি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কোনো প্রভাব ফেলতে পারত না। অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা সীমাহীন দুর্নীতি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের একটি। বছরে সব মিলিয়ে কত বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি হয়, তার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। যে কোনো মূল্যে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে পারলে বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যেত- এটি দেশের চরম শত্রুও স্বীকার করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপচয় বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা। দেশের একশ্রেণির কর্তাব্যক্তির মধ্যে যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকার মোহাম্মদপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর ৮৪ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০৯ সালে উদ্বোধন হওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবী (বছিলা ব্রিজ) সেতুটি পানির স্তর থেকে উচ্চতা কম হওয়ায় নৌচলাচলে বিঘ্ন ঘটে বলে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সারাদেশে এমন ৮০৫টি লোহার সেতু ভেঙে নির্বিঘ্ন নৌচলাচলের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উচ্চতায় পুনর্নির্মাণ করা হবে। এই যে এত বড় অপচয়, এর দায় কে নেবে? এমন অসংখ্য অপচয়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। সরকার যদিও এসব অপচয়ে এখন রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করছে। তার পরেও ফাঁকফোকর গলিয়ে যাতে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প পাস হয়ে না যায়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে এবং এর একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

নিশ্চয়ই মনে আছে ২০০৭-০৮ সালের বিশ্বমন্দার কথা। সে সময় দেশের একশ্রেণির সংশয়বাদী মন্দার ব্যাপারে আমাদের মনে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মন্দা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। এবারও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। মনে সাহস রাখুন। এবারও বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা অর্থনীতি সংকটে ফেলবে না।