পবিত্রতার বিচারে পাহাড়ের শ্মশানগুলোর অবস্থান একেবারে তলানিতে; সে কথা অনেক জায়গায় লিখেছি। শ্মশান মানে ভয়, অপবিত্র এবং অনেকের কাছে খারাপ জায়গা। ফলে শ্মশানগুলো সাধারণত চরম অবহেলায় পড়ে থাকে। শুধু প্রয়োজনের সময় মানুষ জড়ো হয়। আর জড়ো হওয়া মানুষের চাপে ঝোপঝাড় পরিস্কার হয়। পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কোথাও মিলেমিশে শ্মশানের জায়গা পরিস্কার করার উদ্যোগ দেখিনি।

আমাদের শ্মশানগুলোতে ইদানীং নতুন এক ধরনের আবর্জনা যুক্ত হতে দেখা গেছে। এতদিন ভেবেছিলাম, মৃতদেহে যে পুষ্পমাল্য দেওয়া হয় সেগুলো প্রাকৃতিক ফুলের। সম্প্রতি গ্রামে গিয়ে শ্মশানে পড়ে থাকা পুষ্পমাল্য দেখে সে ভুল ভেঙেছে। যে ক;টি (৬টি) পুষ্পমাল্য দেখেছি, সবই ছিল প্লাস্টিক আর কাপড়ের ফুল দিয়ে সাজানো। এই ফুলগুলো পেরেক দিয়ে মোটা ককশিট ফ্রেমে লাগানো। একেকটি পুষ্পমাল্যে শতাধিক পেরেক ব্যবহার করা হয়েছে। এসব পেরেক নিঃসন্দেহে শ্মশানে জড়ো হওয়া মানুষদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ আমরা শ্মশানকে প্রায় মর্যাদাহীন করে রাখলেও মড়া নিয়ে সেখানে প্রবেশের সময় অনেকে জুতা খুলে থাকেন।

বিয়ে বা সরকারি-বেসরকারি নানা অনুষ্ঠানে অতিথিদের সামনের টেবিলে প্লাস্টিকের ফুলের স্তূপ এখন নতুন কিছু নয়। কার কেমন লাগে জানি না, আমার কিন্তু প্লাস্টিকের ফুল কারও ঘরের কোনায় সাজানো দেখলেও বিরক্তি লাগে। আমাদের চারপাশে কত ফুল! তারপরও বিশ্রী রঙের নিম্নমানের প্লাস্টিকের ফুল কেন কিনে রাখতে হবে, বুঝি না। বাজারে ফুলের চারা, টব এত সস্তা। ফুলের চারা লাগিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্যও সংগ্রাম করতে হয় না। তার পরও প্রাকৃতিক ফুল বাদ দিয়ে আমরা প্লাস্টিকের ফুলের দিকে ঝুঁকেছি।

পৃথিবীতে মানুষের সঙ্গে ফুলের সম্পর্ক জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। বহির্বিশ্বে কোনো মানুষের মৃত্যু, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাতে কয়েকটি ফুল ধরিয়ে যাওয়ার রীতি সব সময় পত্র-পত্রিকা, খবরে দেখে থাকি।

পাহাড়ি সমাজে কারও মৃত্যুতে সচরাচর পরিবারের লোকজনকে ফুল দিয়ে মৃতদেহ সাজাতে দেখা যায়। আর দর্শনার্থীরা মূলত মৃতদেহের ওপর টাকা দান করে থাকেন। ইদানীং বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন মিলে মৃতদেহে পুষ্পমাল্য দেওয়ার একটি রীতির প্রচলন ঘটেছে। পুষ্পমাল্য ঘিরে ছবি তোলা এবং শোকবার্তা দিয়ে ব্যানার বানানোও এখন অনেকটা সাধারণ রীতিতে রূপ নিয়েছে। আমি কোনোটির বিপক্ষে নই। তবে প্লাস্টিকের ফুলের মালা দেওয়াকে মানতে কষ্ট হয়।

কারও মৃত্যুতে ফুল দিতেই পারি। তাই বলে সব সংগঠনকে, বন্ধুকে মিলে পুষ্পমাল্য বানিয়ে দিতে হবে? রাষ্ট্রীয় পর্যায় কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে আমরা পুষ্পমাল্যের ব্যবহার হতে দেখি। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানও গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির প্রয়াণে শ্রদ্ধা-শোক জানাতে পুষ্পমাল্য দিয়ে থাকেন। আমাদের এই সংস্কৃতিটি এখন পাড়া-গ্রাম পর্যায়েও প্রবেশ করেছে। যেন পুষ্পমাল্য দেওয়াই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কিংবা শোক জানানোর সেরা উপায়। তবে, আমরা শ্রদ্ধা জানানোর বদলে প্রদর্শনবাদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছি কিনা- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো দেখলে প্রশ্ন জাগে। কাউকে ভালোবাসা জানাতে একটি ফুল কিংবা এক গুচ্ছ ফুলই হতে পারে সেরা উপহার। আমরা কারও মৃত্যুতে অনেকে যদি ১টি করে ফুল হাতে নিয়ে মৃতদেহের কাছে যাই, তা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও সুন্দর দেখাবে।

পাহাড়ে যাঁরাই চাকরি নিয়ে গেছেন; অনেকেই ফেরার সময় এক বা একাধিক ট্রাকে আসবাবপত্র নিয়ে ফিরেছেন। আর খেয়াল করলে দেখবেন, আসবাবপত্র সবই 'রাজকীয় মার্কা' এবং মোটা মোটা কাঠ দিয়ে তৈরি। একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও রাজকীয় খাট-পালং বানিয়ে নিয়ে আসেন। আমার ধারণা, সারাজীবন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রভাবশালী নেতা ও পয়সাওয়ালাদের বড় হাতলযুক্ত ফুল আর কারুকাজ করা এবং প্রয়োজনের তুলনায় বড়, প্রশস্ত, উঁচু চেয়ার, সোফা ব্যবহার করতে দেখে সুযোগ পেলে নিজেরাও এমন আসবাব বানিয়ে ফেলি। একইভাবে আমরা পাহাড়ের মানুষও পুষ্পমাল্যের ব্যবহার দেখে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য পুষ্পমাল্য ব্যবহার শিখে ফেলেছি। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা জানাতে স্রেফ একটি তাজা ফুলও যে অনেক কার্যকর হতে পারে, তা আর চিন্তা করিনি। প্লাস্টিকের পুষ্পমাল্য দেয়ার চেয়ে একটি প্রাকৃতিক ফুলের আবেদন ও গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।

আমার মতে, কাউকে প্লাস্টিক ফুল দিয়ে সাজিয়ে শোকবার্তা দেওয়া, ভালোবাসা দেখানো এক ধরনের অপমানের শামিল। একই সঙ্গে আমাদের শ্মশানগুলো আরও আবর্জনায় ভরে উঠবে। আমরা সচেতনভাবে প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার কমানোর চিন্তা করতে পারি। আমরা প্রকৃতির সন্তান। শেষ যাত্রায় প্রকৃতি দিয়েই সম্মান, ভালোবাসা জানানোর চেষ্টা করতে পারি।

প্লাস্টিক আমাকে টানে না। এর বিপক্ষে আমি। এ নিয়ে আমি নিয়মিত লিখছি আর লিখছি। একটি বইও লিখে ফেলেছি 'ভ্যানওয়ালার হাতে বাংলাদেশ' শিরোনামে। এবারে দেখা প্লাস্টিকের পুষ্পমাল্য আমাকে আরও ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা কোথায় যেন চলে যাচ্ছি! প্রকৃতি ছেড়ে আজ মৃত্যুতেও নিম্নমানের প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে দায়সারা কাজ করে চলেছি। আমরা নিজেরাও প্লাস্টিকে পরিণত হতে চলেছি কিনা, তাও ভাবছি।

চিরাচরিত স্থ্থানীয় ফুলগুলোকে ভুলে তরুণদের মাঝে বিদেশি ফুল আর অর্কিডপ্রীতি বেড়েছে। স্থ্থানীয় প্রজাতির ফুল-ফলের প্রতি আমাদের আগ্রহ কমতে কমতে প্লাস্টিকের ফুলে গিয়ে ঠেকেছে। আমরা সাংগ্রাইং এলে আনন্দে মেতে উঠি। অন্যদিকে সাংগ্রাই পাঁই পাহাড় থেকে অনেকটা বিলুপ্তির পথে (দেখুন :অংসুই মারমা, 'পাহাড়ের বিপন্ন প্রতীক', সমকাল, ২১ মার্চ ২২)। ভাবনায় চাকচিক্য বেশি ঢুকে পড়ায় আমাদের মনন-মগজেও প্লাস্টিক স্থান করে নিতে শুরু করেছে।

বন উজাড় করে রাবার গাছ লাগিয়েছি। রাবার লাগাতে মানুষ কুড়িয়ে এনে গ্রাম বানিয়ে নতুন নতুন নাম দিয়েছি। উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে দুটি প্রকল্পে প্রায় ৩০০০ পরিবারকে দিয়ে রাবার চাষ করিয়েছি। রাবার চাষি পরিবারগুলো কেমন দিন কাটাচ্ছে, সে খবর কেউ রাখিনি। এ ছাড়াও রাবার চাষের জন্য প্লটপ্রতি ২৫ একর দেওয়ার নামে কত শত একর শহুরে সমাজের এলিট শ্রেণির লোকজনকে দিয়েছি, তার হিসাব নেই! বান্দরবান জেলায় রাবার চাষ সম্পর্কে জুয়ামলিয়ান আর বুদ্ধজ্যোতির লেখায় যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতেও রীতিমতো অবাক হতে হয়। রাবার স্প্র্যাডিং কমিটির মাধ্যমে ২০,০০০ একর রাবার চাষের কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছিল ৪৬,৭৭৫ একর ( দেখুন :প্রফেসর মংসানু চৌধুরী সম্পাদিত 'পার্বত্য ভূমি সহায়িকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও ভূমি অধিকার, ইজারা এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা' জুন ২০২১, পৃষ্ঠা ১০৯-১১১)। অন্যদিকে শিক্ষিত লোকেরা 'ডিএসএলআর'ময় বিয়ের অনুষ্ঠান করতে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে আলোড়ন তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন এক দল মানুষ মরার ছবি তুলে রাখতে প্লাস্টিকের পুষ্পমাল্য দিয়ে শোক জানানোর চেষ্টা করে চলেছি। চারদিকে নানা অনিয়ম, ঠকবাজি দেখতে দেখতে পাহাড়ের মানুষ নিজেদের চিরাচরিত মূল্যবোধ ভুলে ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়েও নকল ফুল দিয়ে তামাশা করতে শুরু করেছে।

শ্মশানের পরিবেশ, পৃথিবীর পরিবেশকে ভাল রাখতে ছোট ছোট ভূমিকা রাখতে না পারি, অন্তত প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে মরা মানুষকে 'অপমান' বন্ধ করা দরকার। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ছন্দ ক্ষুণ্ণ করে রাবার দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছি বলে এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে রাবার বাগান সৃজন করে চলেছেন। চারদিকে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে আমাদের মনও প্লাস্টিকে গিয়ে ঠেকেছে। এখান থেকে বের হতে না পারলে আমাদের সবাইকে খেয়ে ফেলবে রাবার ও প্লাস্টিক। পাহাড়ে বেচাকেনায় কাঁচা রাবার দুধে মেশানো একটি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে (দেখুন :ঞ্যোহদ্মা মং, 'তোমরা কে-মনে পাহাড়ি মানু?', ২২)।

প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে বলে মানবদেহের রক্তেও প্লাস্টিকের কণার উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে পড়েছি। পবিবেশবিদরা বলছেন, পৃথিবীতে আর এমন কোনো স্থান নেই যেখানে প্লাস্টিক নেই। তা সত্ত্বেও আমি বলব, মানুষকে সম্মান জানাতে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে প্লাস্টিক বর্জন করা উচিত। প্রাকৃতিক ফুল ব্যবহার করে মনকে প্রাকৃতিক রাখার চেষ্টা থাকা দরকার। 'প্লাস্টিক ফুলের বিয়ে', 'প্লাস্টিক ফুলের পুষ্পমাল্য' নমুনা দেখে বলতে পারি, আমরা প্রকৃতি থেকে ইতোমধ্যে অনেক দূরে সরে এসেছি। মরা মানুষের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন ছড়িয়ে দেওয়াকে মানা যায় না; একইভাবে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সম্মান জানানোর চেয়ে তা না করাই অনেক ভালো বলে মনে করি। বিয়েবাড়িতে উপহার নিয়ে যাওয়ার রীতি প্রচলনের ফলে অনেকে বিব্রতকর অবস্থ্থায় পড়ে যান বলে সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন, যেটি সমাজের জন্য মোটেও ভালো দিক নয়। পুষ্পমাল্য বানানো খরচের ব্যাপার; সবার পক্ষে তা বহন করা সম্ভবও নয়। মৃত মানুষকে দেখে আসা মহামূল্যবান একটি প্রথা। এ প্রথাটি ধরে রাখতে আমাদের হাতের কাছে পাওয়া একটি ফুল নিয়েও যেতে পারি কিনা- চিন্তাভাবনা করে দেখতে পারি।