কোথায় যেন পড়েছিলাম হরতালের জনক মহাত্মা গান্ধী। আমাদের জীবনে এতকিছু মুখস্থ করতে হয়েছে যে, হরতালের মতো একটি বিষয়ের জনক প্রশ্নের উত্তর জানতেও গাইড বই খুলতে হয়। গান্ধী ১৯১৯ সালে প্রথম হরতাল ডেকেছিলেন। ভারতে ব্রিটিশদের একটি নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের প্রতিবাদে নীরব ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে তা আহ্বান করা হয়েছিল। অহিংস নীতির জন্য খ্যাত গান্ধীর হরতাল ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। সেই সময়ে হরতাল বেশ অভিনব প্রতিবাদ হিসেবে কার্যকর ছিল বলে ধরা হয়। গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের যুগ শেষ হয়েছে। ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ বিদায় হয়েছে। পাকিস্তান ও ভারত দুই স্বাধীন দেশ সৃষ্টি হয়েছে। আবার পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু হরতাল এখনও রয়ে গেছে রাজনীতিতে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ে হরতালকে ব্যবহার করেছে। তবে শুরুর দিনের মতো হরতালের সেই নিরীহ চেহারা ও মেজাজ এখন আর নেই।

কালের বিবর্তনে হরতাল আর অহিংস থাকেনি। হয়ে উঠেছে সহিংস। এক থেকে দেড় দশক আগেও হরতাল মানে ছিল জ্বালাও-পোড়াও, গাড়ি ভাঙচুর, মিছিল, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। আবার এই হরতালকে দেখা গেছে নিজের নাম বাঁচাতে লড়াই করছে! অর্থাৎ, হরতালের মধ্যেই গাড়ি চলেছে, মিছিল বের হতে পারেনি। যাঁরা হরতাল আহ্বান করতেন, তাঁরা ঘোষণা দিয়েই সরে পড়তেন। গত প্রায় সাত-আট বছরে হরতাল প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। দেশের রাজনীতিতে প্রায় ভুলতে বসা হরতালকে ফিরিয়ে আনলো বাম গণতান্ত্রিক জোট।

জ্বালানি তেল, সার, খাদ্যসহ নিত্যপণ্য ও পরিবহনের ভাড়া কমানো এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল শেষ হয়েছে আজ বৃহস্পতিবার। এই হরতালের সমর্থনে বুধবার রাতে রাজধানীর পল্টন মোড়ে মিছিল ও টায়ারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেল, এ সময় হরতালের সমর্থক চারজনকে আটকও করা হয়। একটা সময় হরতালের আগের সন্ধ্যা থেকেই বাড়তি সতর্কতা দেখা যেত। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে আসত। বেসরকারি অফিসের লোকজনও সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরার জন্য তৈরি হয়ে যেতেন। এবারের বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা হরতালের আগের রাতে মুহূর্তের জন্য অতীতে নিয়ে গেল। তবে রাত পোহালেই তা আবার ফিকে হতে দেখা গেল। অর্থাৎ, হরতাল তেমন জমেছে বলা যায় না! যদিও হরতাল আহ্বানকারীরা বলছেন, এই হরতালে জনগণের 'নৈতিক' সমর্থন ছিল তাই হরতাল 'সফল' হয়েছে।

তবে এটা সত্যি, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সংকটের পাশাপাশি যেভাবে নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে তা অসহনীয় হয়ে পড়েছে। সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধি জীবনকে একেবারেই অতিষ্ঠ করে তুলছে। আবার এর মধ্যে পানির দাম সেপ্টেম্বর থেকে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোরও প্রক্রিয়া চলছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ডাকা হরতালের প্রতি 'নৈতিক' সমর্থন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে শেষ পর্যন্ত হরতাল কতটুকু ও কীভাবে হলো, এটাও খেয়াল করতে হবে।

রাজধানী ঢাকায় হরতালের আগের রাতে মিছিল, টায়ারে আগুন, চারজন আটক, গাড়ি ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে যে হরতালের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, হরতালের দিনে তা একই গতিতে দেখা গেল। ঢাকার পল্টন, শাহবাগে মিছিল হয়েছে। পল্টনে রাস্তা দখল হয়েছে। আবার পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে কাঁটাবনসহ আরও দুয়েকটি জায়গায়। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও হরতালের সমর্থনে মিছিল হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে আকারে ছোট হলেও হরতালের সপক্ষে মিছিল হয়েছে। তবে যেটা লক্ষণীয়, হরতালে গাড়ি থেমে থাকেনি। এটাকে হরতালের সমর্থকরা বলছেন, সরকারের চাপে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামাতে বাধ্য করেছে!

সরকারের বিপক্ষে জ্বলাময়ী বক্তৃতা বেশ হয়েছে এবারের হরতালে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের দেখা গেছে বক্তব্য শুনে হাসছেন! পুলিশকে মারমুখী হতে দেখা যায়নি। অতীতে হরতাল শেষ হলে হরতাল আহ্বানকারীদের যেভাবে বলতে শোনা যেত, 'জনগণ সর্বাত্মকভাবে হরতাল পালন করেছে' এবার তা অতটা শোনা যায়নি। আবার সরকারে যাঁরা থাকেন, তাঁরাও যেভাবে বলতেন, 'দেশের জনগণ হরতালকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন' এটাও শোনা যায়নি।

লক্ষণীয় যে, ভুলতে বসা হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি আবার ফিরে আসছে। হরতালের দিনে মাঠে পক্ষ-বিপক্ষ তেমন উপিস্থিতি না থাকলেও এভাবে রাজনীতির ময়দানে হরতালের ফিরে আসাটা নতুন শুরু বলতে হবে। বিশেষ করে, আগামী দিনে নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ দখলের লড়াই শুরুর আগে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নিজেদের ক্ষমতার প্রদর্শন করবে হরতাল হয়ে উঠতে পারে তার একটি মাধ্যম।

ইতিহাসের অহিংস হরতালের দিন থেকে সহিংস হরতালের দিন পেরিয়ে 'নৈতিক' হরতাল কতটা সফল হলো তা আজকের মাঠ দেখে আন্দাজ করা ঠিক হবে না। আগামীতে হরতাল আবার কীভাবে ফিরে আসে তার ওপর নির্ভর করবে আজকের হরতালের সফলতা-ব্যর্থতা।