রোববার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় স্কুলছাত্র আলী হোসেন (১৬)। সে তেজগাঁওয়ের সরকারি বিজ্ঞান হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে ফার্মগেটে কোচিংয়ের জন্য যাওয়ার পথে একটি মাইক্রোবাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে সে রাস্তায় ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার পরদিন মাইক্রোবাসচালক জিয়াউল হককে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাইক্রোবাসকে জব্দ করা হয়েছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ খবরটির মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। কারণ মাঝেমধ্যে রাজধানীর সড়কে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গাড়িচাপায় প্রাণ ঝরে। তখন সংবাদমাধ্যমে গতানুগতিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চালককে গ্রেপ্তার করে; গাড়িটিও জব্দ করে।

তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু তিনটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ২০০৫ সালে শাহবাগ মোড়ে বাসচাপায় নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাম্মী আক্তার হ্যাপী (২১)। গত বছরের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান (১৭)। দুর্ঘটনার পর চালক রাসেল খানকে আটক করে পুলিশ। জব্দ করা হয় গাড়িটি। উল্লিখিত তিনটি দুর্ঘটনার মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে। নিহতদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়, একজন কলেজ ও একজন স্কুলের শিক্ষার্থী। তিনটি দুর্ঘটনার পরই চালককে গ্রেপ্তার করা হয়; জব্দ করা হয় গাড়ি। তিনটি অকাল মৃত্যুর পরই শিক্ষার্থীরা সড়কে আন্দোলনে নামে। কর্তৃপক্ষ বিচারের আশ্বাস দেয়। হ্যাপীর স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। নাঈমের নামে গুলিস্তানে ফ্লাইওভার নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আলীর নামে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ঘোষণা এখনও শোনা যায়নি। 

বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোকে দায়ী করা হয়। নাঈমের দুর্ঘটনার পর জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের আসল চালক আরেকজনকে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, যার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। চালকের সহকারী থেকে এক সময় চালক হয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণে দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকায় এসব চালকের একটি অংশ প্রায়ই অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ডেকে আনছে। ২০১৮ সালে কারওয়ান বাজারে বেপরোয়া দুই বাসের চাপায় হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তিতুমীর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের। এ ঘটনার পর বিআরটিসি বাসের চালক ওয়াহিদ ও স্বজন পরিবহনের বাসের চালক খোরশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অন্য চালকরা হুঁশিয়ার হচ্ছেন না।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত ও ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। এ সড়ক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ৯ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন করে তারা। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন ও অবরোধ করতে চাইলে দুর্ঘটনার পরদিন থেকেই পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও সরকার সমর্থক বলে অভিযুক্ত যুবকরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রছাত্রী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং ছাত্রছাত্রীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়নমূলক ব্যবস্থা দেশ-বিদেশে তীব্রভাবে নিন্দিত হয়।

পরে ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃতীয় মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে। সে আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়; যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। সেই আন্দোলনের পরও সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে সহপাঠী 'হত্যার' প্রতিবাদ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বারবার রাস্তায় আন্দোলনে নামতে হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি বিজ্ঞান হাই স্কুলের শিক্ষার্থী আলী হোসেনের মৃত্যুতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে তার সহপাঠীরা। 

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক-মালিকরা দায়ী নয়। যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া রয়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এবং চাহিদা অনুযায়ী ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস না থাকা। তেজগাঁও শিল্প এলাকার যে স্থানে আলী হোসেন নিহত হয়েছে, সেখানে মালিবাগ থেকে মগবাজার হয়ে উড়াল সেতু মূল সড়কের সঙ্গে মিশেছে। ফলে উড়াল সেতু থেকে নেমে আসা যানবাহন অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। উড়াল সেতু ও সড়কের সংযোগস্থলে সড়কের উভয় পাশে লোহার ব্যারিকেড ভাঙা থাকার সুযোগ নিয়ে অনেক পথচারী রাস্তা পার হয়; যদিও একটু দূরেই রয়েছে ফ্লাইওভার। এ থেকেই বোঝা যায়, ব্যারিকেড মেরামতে যেমন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা রয়েছে, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী ফ্লাইওভার ব্যবহারেও রয়েছে পথচারীদের উদাসীনতা। তাই জনসাধারণের সচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

হ্যাপী, নাঈম ও আলীর বয়স ১৬ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। বয়স বিবেচনায় তারা যথেষ্ট সচেতন। প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বয়স ৬ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। তাদের সবাই মা-বাবার হাত ধরে স্কুলে যায় না। সুতরাং রাস্তা পারাপারে তারা তুলনামূলক অনভিজ্ঞ থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। চালকদের বেপরোয়া আচরণ ঠেকানো না গেলে সড়কে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতেই থাকবে। একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না- এ কথাটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। আলী হোসেনের বাবা বরিশালের মুলাদী থেকে এসে ঢাকা শহরে একটি খাবার হোটেলে চাকরি করেন। স্বল্প ভাড়ায় পরিবার নিয়ে কুনিপাড়ায় বাস করেন। কষ্ট করে সন্তানকে সরকারি বিজ্ঞান হাই স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। অন্য দশ বাবার মতো সন্তানকে ঘিরে তাঁরও অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মাইক্রোবাসের চাপায় পিষ্ট হয়েছে তাঁর সেই স্বপ্ন। ফুল ফোটার আগেই মুকুলে ঝরে গেছে। হয়তো মালিকপক্ষ তাঁকে কিছু অর্থ সহায়তা দেবে। কিন্তু তাঁর পরিবারের যে ক্ষতি হয়ে গেল, তা কি পূরণ হবে?