শুরুতেই একটি তথ্য জানিয়ে রাখি। পৃথিবীর ১৭৮টির দেশের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৩টি দেশ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে থাকে। এসব দেশের মধ্যে উন্নত, উন্নয়নশীল, মধ্যম আয়ের ও অনুন্নত দেশও রয়েছে। 

এবার মূল কথায় আসা যাক। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন এই কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর সম্পন্ন না হতেই পুরোনো সুরে গান গাইতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, এর আগে দেশে যে দুটি নির্বাচন হয়ে গেল ২০১৪ এবং ২০১৮-তে আগামী নির্বাচনকেও সেভাবে সম্পন্ন করতে চায় বলেই মনে হচ্ছে। 

এবার বেশ আগেভাগে কাজ শুরু করলেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন বিশ্বাস হারিয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত 'ইসির রোডম্যাপ একতরফা' শীর্ষক সংবাদে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানা গেল। এখানে বর্তমান ইসির বিরুদ্ধে 'ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মত পাল্টে ফেলার অভিযোগ' উঠে এসেছে। এটাকে রীতিমতো প্রতারণা বলে অভিহিত করছেন রাজনৈতিক দলের নেতা, দেশের বিশিষ্টজন ও নির্বাচন সংশ্নিষ্টরা। ইসি বলছে, গত জুলাইয়ে সংলাপে অংশ নেওয়া ২৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৭টি ইভিএমের পক্ষে এবং ১২টি বিপক্ষে মত দিয়েছে। তবে তাদের তালিকায় ইভিএমের পক্ষে থাকা একাধিক দল দাবি করেছে, সংলাপে তাদের অবস্থান ছিল ইভিএমের বিরুদ্ধে। যেসব দল ইভিএম ব্যবহারের শর্ত পূরণের কথা বলেছিল; সেসব শর্ত পূরণ না করলেও তাদের ইসি ইভিএমের পক্ষে বলে উল্লেখ করেছে। (সমকাল ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২)। 

আগামী নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে তা নির্ধারণে ইসি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল। সেই সংলাপ আয়োজনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাতে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতামত জানিয়েছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সে সময়ে বলেছিলেন, সবার মতামত নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি ঠিক করা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সবার মতামত নেওয়া হলেও ইসির রোডম্যাপে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। এটা করতে গিয়ে ইসি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত বদলে দিয়ে শুরুতেই আস্থার সংকট বাড়িয়ে তুলেছে। এদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এই রোডম্যাপকে স্বাগত জানালেও বিএনপি ও জাতীয় পার্টি বলছে, বর্তমান ইসির সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষমতা বা যোগ্যতা নেই। তারা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে রোডম্যাপ করেছে। এ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলও আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছে। আবার কোনো কোনো দল শর্তসাপেক্ষে ইভিএমের পক্ষে মতামত দিয়েছে। 

তবে আগামী জাতীয় নির্বাচন ইভিএমে করার জন্য ক্ষমতাসীন দল ও সরকার কতটা উৎসাহী, তা কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে পরিস্কার। তিনি তখন বলেছিলেন, 'আমরা ৩০০ আসনেই ইভিএম চাই। মন থেকে চাই, চেতনা থেকে চাই।' বিষয়টিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান যে শক্ত, তা বোঝাতে তিনি বলেন, 'আমরা গত নির্বাচনের সময় কমিশনে বলেছি, আমাদের দলের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আমাদের পার্টির স্ট্যান্ড হচ্ছে, দিস ইজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার, আমরা ইভিএম পদ্ধতির পক্ষে, রাখঢাক করে কোনো লাভ নেই'। তাই ইসি যখন বলছে আগামী নির্বাচনে ১৫০ আসন ইভিএমে হবে, তখন যেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কথার প্রতিধ্বনি ফিরে আসে। 

এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। সদ্য প্রয়াত ড. আকবর আলি খান তাঁর মৃত্যুর আগে সর্বশেষ একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেটি ছিল আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে। চলতি মাসের ৬ তারিখ করা সেই বিবৃতিতে দেশের আরও ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিক আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার কথা বলেছিলেন। যেখানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা ইভিএম পছন্দ করছেন না, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো ইভিএমের বিরোধিতা করছে সেখানে নির্বাচন কমিশনার কেন ইভিএমে এত আগ্রহী হয়ে উঠছেন? আর কমিশন তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শুরুতেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে বলে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তা এই কমিশনকে আরও আস্থার সংকটে ফেলবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন ইভিএম কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছে বলেও জানা গেছে। যেখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্বচ্ছতার ঘাটতির প্রশ্নে ইভিএম থেকে ব্যালটে ফিরছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন ইভিএমে নির্বাচন করবে? আবার এই নির্বাচনের অংশীজন যারা সেই রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও রয়েছে এর বিরোধিতা। আগামীর বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই অবিশ্বাস ও হানাহানি বন্ধ করতে ইসিকে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

বাংলাদেশের ইভিএমের একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এতে ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) নেই। তাই একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পান না। ফলে নির্বাচন কমিশন ভোটের যে ফলাফল ঘোষণা করবে তাই চূড়ান্ত বলে ধরা হয়। এখানে ভোট পুনর্গণনা বা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ থাকে না। দেশে রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনও ঐকমত্য হতে পারেনি, সেখানে ইভিএম নিয়ে শুরুতেই এই বিতর্ক আগামী নির্বাচনকে ঘিরে আরও সন্দেহ, ভয় ও আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে। নির্বাচন কমিশনের প্রথম কাজ হচ্ছে আস্থা অর্জন করা। সেখানে উল্টো মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া কমিশন এর খেসারত কীভাবে দেয়- ভবিষ্যৎই তা বলে দেবে।