রাজধানীর বনানীতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পূর্বঘোষিত মোমবাতি প্রজ্বালন ও মৌন অবস্থান কর্মসূচিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা হামলা করেছেন। এ হামলায় আহত হয়েছেন বিএনপির অন্তত ২০ নেতাকর্মী। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এভাবে হামলা দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। হামলার আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সড়কে মিছিল করে বিএনপি নেতাকর্মীদের দিকে তেড়ে আসেন বলে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। সেই মিছিলে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কিংবা বনানী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত না থাকলেও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এম এ কাদের খান, বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি জসিম উদ্দিন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন, বনানী থানা কমিটির সাবেক সভাপতি মো. মাসুদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা উপস্থিত ছিলেন। আরেকটি মিছিলের নেতৃত্ব দেন বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় কাউন্সিলর মফিজুর রহমান।

বিএনপি জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সম্প্রতি আন্দোলনে নিহত নেতাকর্মী হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবিতে শনিবার সন্ধ্যায় ওই কর্মসূচি পালন করে। তারা সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল ব্যাহত করেনি; গাড়িতে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করেনি। এরকম একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলা কেন করতে হলো? আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন আসন্ন। এ অবস্থায় নতুন কমিটিতে আরও ভালো পদ পাওয়ার আশায় কি অতি-উৎসাহীরা এ হামলা করেছে? সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের এক কেন্দ্রীয় নেতা অভিযোগ করেছেন, বিএনপি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চায়। বনানীতে অহিংস আন্দোলনে সহিংসতা সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগই তো পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাল। যদিও হামলার জবাব দিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও ক্ষমতাসীন দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সঙ্গে টিকতে না পেরে পিছু হটে বিএনপি। আওয়ামী লীগ নেতারা হামলার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁরা অন্য কর্মসূচি শেষ করে ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত নন। তাহলে প্রশ্ন হলো- হামলাটা কারা করল?

যদি বিএনপির কর্মসূচি পালনের অনুমতি না থেকে থাকে, তাহলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে পারত। হামলার পর বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া বলেন, 'দুই দলেরই আলাদা কর্মসূচি ছিল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শেষ করার পর পুলিশ ফিরে আসে। এরপর কারা, কী করেছে- আমরা জানি না। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর নাকি হঠাৎ হুড়োহুড়ি-দৌড়াদৌড়ি হয়েছে; পরে তো চলে গেছে।' ওসি সাহেব যেভাবেই দায় এড়ানোর চেষ্টা করুন, সংবাদমাধ্যমে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্রই বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা শুরু হয়। এতে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার দায় এড়ানো যাবে না। বড় দুটি রাজনৈতিক দলের একই সময়ে কর্মসূচি থাকলে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখা উচিত ছিল পুলিশের।

বিএনপি ধোয়া তুলসী পাতা নয়। নিকট অতীতে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের হাতে ইটপাটকেল ও লাঠিপেটায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আহত হয়েছেন। কয়েক মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কতিপয় নেতাকর্মীও সহিংস হয়ে ওঠেন। ফলে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সহিংসতায় উভয় দলের একাধিক নেতাকর্মী আহত হন। কিন্তু শনিবারের কর্মসূচিতে তো কোনো সহিংসতা ছিল না। সেখানে কেন হামলা করতে হলো? বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে এর জবাব দেওয়ার জন্য অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বনানীতে হামলার আগে কুমিল্লায় নৃশংসতার শিকার হন বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলু। রেহাই পাননি তাঁর স্ত্রী শামীমা বরকত লাকীও। নোয়াখালীর গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার পথে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বিপুলাসার বাজারে একটি হোটেলে যাত্রাবিরতি করেন তাঁরা। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। বুলুসহ অন্যদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় যুবলীগ নেতা ইকবাল হোসেন সমকালকে জানান, বিএনপির নেতাকর্মীরা অশালীন স্লোগান দেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি শুনেছেন। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, বিএনপি নেতারা অশালীন কিংবা উস্কানিমূলক স্লোগান দিয়েছেন। এর জবাব রক্ত ঝরিয়ে দিতে হবে?

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রতিটি রক্তকণার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। এই জবাব দিতে গিয়ে কি বিএনপি সহিংসতার পথ বেছে নেবে নাকি ক্ষমতায় এসে আইনি প্রক্রিয়ায় জবাব দেবে- তা রিজভী সাহেবের বক্তব্যে পরিস্কার নয়। সহিংসতার উস্কানি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যেও পাওয়া যাচ্ছে। খেলা, পাল্টা খেলার হুমকি আমরা উভয় দল থেকেই পাচ্ছি। ২০১৪ সালে নির্বাচন প্রতিহত করার নামে দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল বিএনপি। সেই অবরোধ এখনও চলমান নাকি প্রত্যাহার করা হয়েছে- তা স্পষ্ট করা হচ্ছে না। সেই সময় গণপরিবহনে পেট্রোল বোমায় অনেক মানুষ জীবন হারিয়েছে। ২০০৬ সালে লগি-বৈঠা বনাম কাস্তের সহিংসতার কথা আমরা ভুলে যাইনি। জাতীয় নির্বাচন কাছাকাছি এলেই সহিংসতা নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। ১ বছর ৩ মাস পর আবার জাতীয় নির্বাচন। যৌক্তিক আন্দোলন করার অধিকার সংবিধান দিয়েছে। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হোক অহিংস, আর যারা সহিংস হবে তাদের ঠিকানা হোক লাল দালান।