২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সে সময়ের যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের পরে জানা গিয়েছিল রাজধানী ঢাকার বুকে জমজমাট ক্যাসিনো ব্যবসার খবর। একের পর এক প্রকাশ হচ্ছিল কীভাবে মার্কিন মুলুকের ক্যাসিনো আমাদের দেশেও বেশ শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে। 

ক্যাসিনোকে সোজা বাংলায় বলা যায় জুয়া খেলার জায়গা। ১৯৩১ সালে আমেরিকার নেভাদায় জুয়া খেলাকে বৈধতা দেওয়া হলে সেখানে প্রথম ক্যাসিনো গড়ে ওঠে। জুয়া খেলার বাহারি রঙের বোর্ড, পানীয়র ব্যবস্থা ও উপদ্রব না করার নিশ্চয়তা পাওয়ায় আমেরিকায় ধীরে ধীরে ক্যাসিনো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই ক্যাসিনো বাংলাদেশে কীভাবে এলো? 

প্রচলিত আইনে দেশে জুয়া খেলা বেআইনি। বেআইনি কাজ একটি দেশের খোদ রাজধানীতে শক্ত অবস্থান নিয়ে চলতে থাকার খবর যখন বের বের হয় তখন দেশবাসী অবাক হয়েছিল। সেই সময়ে একে একে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, ঠিকাদার জি কে শামীম, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের এনামুল হক আরমান, এনামুল হক এনু ও রুপন ভুঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনো কারবারি সেলিম প্রধান, কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান রাজীব, সম্রাটের সহযোগী জাকির হোসেন, ময়নুল হক মনজু, ক্যাসিনো কারবারি আক্তারুজ্জামান, রোকন মিয়া, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাইফুল ইসলাম, তুহিন মুন্সী ও নবীর হোসেন। দেশে ক্যাসিনোবিরোধী ৪৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৩২টিতে র‌্যাব ও ১৭টিতে অভিযান চালায় পুলিশ। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় ২৮০ জনকে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বেশ প্রশংসা পেয়েছিল। এই অভিযানকে আওয়ামী লীগের ভেতরে ও বাইরে 'শুদ্ধি অভিযান' হিসেবে বলা হয়েছিল। যদিও সে সময়ে অভিযানে আটকদের পরিবারের সদস্য ও সমর্থকরা বলতে শুরু করেছিলেন, এই অভিযান হচ্ছে মূলত দলীয় কোন্দল নিরসন এবং দলের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক করার জন্য। তখন প্রকাশিত সংবাদ বিশ্নেষণ করে এবং টাকা উদ্ধার, মামলার ধরন ও মামলার কার্যকারিতা দেখলে এ বিষয়ে আরও পরিস্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত 'ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতারা একে একে মুক্ত হচ্ছেন' শিরোনামের সংবাদে এই বিষয়ে আরও বেশকিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। দেশব্যাপী আলোচিত ক্যাসিনোকাণ্ডের তিন বছর হয়ে গেল। সমকালে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ক্যাসিনোকাণ্ডের 'হোতা' হিসেবে গ্রেপ্তাররা একে একে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এরই মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছেন যুবলীগের বহিস্কৃৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। কারাগারে থাকা অন্যরাও জামিনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। 

রাজধানীর ক্লাবপাড়া ঘিরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা আটক হওয়ার পরে অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। এখন পলাতক অনেকে আবার ফিরে এসেছেন। অনেকে আবার অনলাইনে ক্যাসিনো ও জুয়ার কারবার খুলে বসেছেন।

এখন তিন বছরের মাথায় এসে ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সম্রাট ও খালেদদের জামিন হচ্ছে কেন? আবার গ্রেপ্তার হিসেবে থাকলেও এই সময়ে সম্রাট বেশিরভাগ সময় ছিলেন হাসপাতালে। সেই সময়ে বলা হয়েছিল গুরুতর অসুস্থ সম্রাটের চিকিৎসা প্রয়োজন। তাই তাঁকে কারাগারে না রেখে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। কিন্তু জামিন পাওয়ার পরে কারাগার (হাসপাতালের প্রিজন সেল) থেকে বের হয়েই সম্রাটকে দেখা গেল আগের রূপে। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর গত ২৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল ছাড়েন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিস্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। প্রকাশ্যে এসেই তিনি দলবল নিয়ে রাজপথে বড় ধরনের মহড়া দেন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর রাতে কারামুক্ত হন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। 

সম্রাট ও খালেদের বিরুদ্ধে কোনো মামলায় বিচারকাজ শুরু হয়নি এই দীর্ঘ সময়ে। তাহলে এই তিন বছর পরে এখন তাদের কেন মুক্ত করা হচ্ছে এবং সেই সময়ে আটক করা হয়েছিল কেন? এই বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনো নেতা মুখ খুলছেন না, অথচ রাজপথে আন্দোলনে থাকা বিএনপির কোন নেতা কখন কী বক্তব্য দিয়ে থাকেন, আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা সে বিষয়ে পাল্টা বক্তব্য দিতে কালবিলম্ব করেন না। এখন যদি সম্রাট ও খালেদের জামিন বিষয়ে তাঁদের মতামত পাওয়া যেত, তবে তাঁদের জন্য আমরা একটি বড় হাততালি দিতে পারতাম। 

ক্যাসিনো হোতাদের জামিন প্রশ্নে রাজনীতির ময়দানে কান পাতলে যা শোনা যায়, তা কিন্তু মোটেই হাততালি পাওয়ার মতো নয়। ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট যখন আটক হন, তখন তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের শীর্ষ নেতা। ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশে লোক জড়ো করতে এবং আধিপত্য বিস্তারে তাঁর একটি প্রভাব আছে। এখন বিরোধী দলকে মোকাবিলায় ঢাকায় সম্রাটের মতো একজনকে আওয়ামী লীগের দরকার বলেই কি তার মুক্তি পেতে আর কোনো বাধা থাকছে না? 

অতীতেও দেখা গেছে, দেশের রাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নানা রকম গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সময়ে এসব গল্প শেষ পর্যন্ত গল্পই থেকে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে গল্পের চেয়েও আশ্চর্য হয়ে বাস্তবে তা ফিরে আসে। দেশে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তোলা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান নিয়েও যে গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখনও শেষ হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষ করে, ক্যাসিনো হোতাদের মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে এই গল্প নতুন রং পাবে এটা নিশ্চিত।