বর্তমান বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। করোনারি আর্টারি ডিজিজ, কার্ডিও মায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিওর, জন্মগত হৃদরোগ, ভাল্‌ভুলার ডিজিজ ইত্যাদি হার্টের বিভিন্ন জটিল রোগ। আধুনিক বিশ্বে এসব রোগের চিকিৎসা এখন সবার হাতের নাগালে। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। বাংলাদেশেই এখন এসব জটিল রোগের সুচিকিৎসা সম্পন্ন হচ্ছে। 

হৃদরোগ জন্মগতভাবেও হতে পারে, আবার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেও শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। আমাদের অস্বাভাবিক ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শরীর সক্রিয় না থাকা ইত্যাদি কারণে হৃদরোগ হতে পারে। একটা সময় আমাদের দেশে এর উন্নত চিকিৎসা সহজলভ্য না থাকায় রোগীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ যেমন উন্নত দেশের পথে হাঁটছে, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে হৃদরোগের যে ধরনগুলোর সুচিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক-

করোনারি আর্টারি ডিজিজ যা এথেরোসেক্লরোটিক করোনারি আর্টারি ডিজিজ নামেও পরিচিত। এ ক্ষেত্রে আর্টারি বা ধমনিতে চর্বি জমা হওয়ার ফলে রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে হূৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দেখা দেয়। বুকে ব্যথা, চাপ অনুভব, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা ইত্যাদি করোনারি আর্টারি ডিজিজের কিছু সাধারণ উপসর্গ। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ গ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর জীবন পরিচালনার মাধ্যমেই এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। তবে রোগ যদি গুরুতর অবস্থায় যায় বা ঝুঁকি থাকে সে ক্ষেত্রে স্টেন্টসহ এনজিওপ্লাস্টির মতো চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনভেদে সিএবিজি বা বাইপাস সার্জারি করতে হয়।

মায়োকার্ডিয়াম বা হার্টের পেশি দুর্বলতাজনিত রোগ কার্ডিও মায়োপ্যাথি নামে পরিচিত। মায়োকার্ডিয়ামের স্বাভাবিক অবস্থা কোনো কারণে পরিবর্তিত হলে হার্ট দুর্বল ও রক্ত পাম্পে অক্ষম হয়ে পড়ে। বুকে তীব্র ব্যথা, ঘন ঘন ক্লান্তি অনুভব, ক্ষুধামান্দ, পেট ফুলে যাওয়া বা অনুভব হওয়া, হাত-পা ফোলাভাব ইত্যাদি কার্ডিও মায়োপ্যাথির কিছু সাধারণ উপসর্গ। রক্ত জমাট বাঁধা রোধে রক্ত পাতলা করা, প্রদাহ ও প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য ওষুধ প্রদান করা হয়। অবস্থা গুরুতর হলে পেসমেকার বা ডিফিব্রিলিটর স্থাপনের প্রয়োজন হয়। এই চিকিৎসার মাধ্যমে হার্টের পেশিগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং হার্টের অন্যান্য যাবতীয় কাজগুলো স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। হার্টের ভাল্‌ভে কোনো জটিলতার ফলে রক্ত প্রবাহ ব্যাহত হলে সেটিকে ভাল্‌ভুলার ডিজিজ বলা হয়। ভাল্‌ভ স্বাভাবিকভাবে কাজ না করলে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে হূৎপিণ্ডের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকের গুরুতর ভাল্‌ভুলার ডিজিজ থাকা সত্ত্বেও উপসর্গ বোঝা যায় না। তবে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা, হাত-পা ও তলপেট ফুলে যাওয়া এই রোগের কিছু উপসর্গ হতে পারে। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। গুরুতর হলে সার্জারির মাধ্যমে ভাল্‌ভ প্রতিস্থাপন এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। জন্মগত ভাল্‌ভের সমস্যা এবং বাতজ্বরজনিত ভাল্‌ভের সমস্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিনা অপারেশনে বেলুন ভালভুলোপ্লাস্টি করা হয় সফলতার সঙ্গে। জন্মগত হার্টের ছিদ্রও বিনা অপারেশনে ডিভাইস স্থাপনের মাধ্যমে বন্ধ করা হচ্ছে নিয়মিতভাবে।

কয়েক বছর আগেও বাইপাস বা ভাল্‌ভুলার সার্জারিতে বুকের স্টারনাম (শক্ত, মোটা হাড়) কেটে সার্জারি করা হতো। কিন্তু এখন তা অনেক সহজ হয়ে গেছে। উন্নত পদ্ধতির সাহায্যে হাড় পুরোপুরি না কেটে শুধু এক পাশ কেটে সার্জারি করা হচ্ছে। যেমন আর্টারির ভাল্‌ভ বা অ্যাওর্টিক ভাল্‌ভ সার্জারিতে স্টারনাম কাটার প্রয়োজন হয় না। দেড় থেকে দুই ইঞ্চির মতো কেটেই সার্জারিটি করা যায়। মাইট্রাল ভাল্‌ভ সার্জারিতেও বুকের এক পাশে ছোট করে কেটেই সার্জারি করা যায়।

এসব ছাড়াও প্রতিনিয়ত এখন বাংলাদেশে হার্টের প্রায় সব রোগের চিকিৎসা সম্পন্ন করতে অত্যাধুনিক পদ্ধতি ব্যবহূত হচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আধুনিক পদ্ধতিতে হার্ট সার্জারির অনেক সুবিধা রয়েছে। কনভেনশনাল সার্জারিতে যেখানে রোগীকে সপ্তাহখানিক হাসপাতালে থাকতে হয়, সেখানে মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারিতে রোগী ২-৪ দিনের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারেন। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে সার্জারি প্রক্রিয়াগুলো কাটাছেঁড়া, দাগ ও ঝুঁকিমুক্ত। যদিও এই সার্জারিগুলো তুলনামূলক জটিল, তবে অভিজ্ঞ হাতে সম্পন্ন হলে তেমন কোনো ঝুঁকি থাকে না। হৃদরোগ চিকিৎসার অত্যাধুনিক সব পদ্ধতি বাংলাদেশে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। তাই হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ এখন আর বহির্বিশ্বের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ।