বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়েছে ৫১ বছর আগে। এ দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের প্রায় এক কোটি ভারতে আশ্রয় নেয় এবং তাঁদের প্রায় দেড় লাখ মানুষ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় ১১টি সেক্টরে।

মুক্তিবাহিনী, ফ্রিডম ফাইটার বা এফএফ, বিএলএফ, গেরিলা বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট-ইবিআর এবং আরও কিছু দল ও গ্রুপে মুক্তিযুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস। 

বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে এ দেশের তরুণ সমাজ অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র নিয়ে 'জয় বাংলা' স্লোগানকে ধারণ করে দুর্ধর্ষ এবং নিকৃষ্ট পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর এ দেশের আল বদর, রাজাকার, আল শামস, শান্তি কমিটি, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতি নিকৃষ্টতম ঐতিহাসিক উপাদানগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশের মুক্তি নিশ্চিত করে।

আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করি ২৬৬ দিনের প্রাণঘাতী, রক্তক্ষয়ী মানবিক বিপর্যয়ের, অমানবিক গণহত্যার দুর্ধর্ষ বিভীষিকাময় ক্ষণ, মুহূর্ত, দিবস, রজনী মাস অতিক্রম করে। আমাদের জাতিসত্তার হাজার বছরের মুক্তির ঠিকানা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের জাতিসত্তার গর্ব ও অহংকার এবং অস্তিত্বের চিরভাস্বর ঠিকানা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

পৃথিবীতে জাতিসত্তার অস্তিত্ব নিয়ে, অহংকার নিয়ে, ঐশ্বর্য নিয়ে, ঐতিহ্য নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা যায় না। জাতিসত্তার ইতিহাস নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির কথা শোনা যায় না। জাতিসত্তার সূর্য সৈনিকদের নিয়ে কোনো বিতর্ক কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় না।

কিন্তু ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ, ৩ লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমের বিনিময়ে অহংকারের বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বিপন্নতা ও বিভ্রান্তিকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলে। এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক অশান্তির। 

এসব অপকর্মের ধারাবাহিকতায় ইদানীং একটি চক্র সুশীল সমাজের নামে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার নামে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার নামে সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামের আগে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি ব্যবহার ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করে, ভিন্ন পথে প্রবাহিত করে। এভাবে একটি গোষ্ঠী অত্যন্ত নিপুণ কৌশলে একটি ধারা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, করে চলেছে। 

এতে করে ওইসব ব্যক্তির প্রচলিত গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে এবং সম্মান করতে গিয়ে তাদের অসম্মান করা হচ্ছে। ইতিহাসের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, ঐতিহ্যের জন্য, আমাদের অহংকারের অর্জনের জন্য ভ্রান্তিকর এই পথ কোনোভাবেই সুখকর নয়, সম্মানের নয়।

এটিকে ঐতিহ্যের নামে, প্রচলিত ফ্যাশনে পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কালিমালিপ্ত করার অপপ্রয়াস বলা যায়। এটি তাদের সতর্কতার সঙ্গে, চাতুর্যতার সঙ্গে ইতিহাস বিকৃতির নীল নকশা, অপপ্রয়াস সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। 

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে অনেকেই। এরা কবিতা লিখছে, প্রবন্ধ রচনা করছে, সেমিনার সিম্পোজিয়াম করছে। পদক-পদবির আবহে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে যাকে ইচ্ছা তাকে, জীবিত অথবা প্রয়াত, নামের আগে 'মুক্তিযোদ্ধা' শব্দটি বসিয়ে দিচ্ছে, জুড়ে দিচ্ছে নির্দি্বধায়, নির্লজ্জ বেহায়ার মতো। এভাবে তারা ইতিহাসকে সংক্রমিত করছে, দূষিত করছে। ইতিহাসের সৌরভ ও অহংকারকে ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।

এরা সময়ের ভ্রান্তিবিলাসে, সরকারি যন্ত্র-মন্ত্রের উদাসীনতায় কেউ কেউ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পদক -পদবি ও সম্মানের ভূষিত হয়ে ইতোমধ্যে নিজেদের ভারী করে তুলেছে। এরা এই সময়ের ভ্রান্ত-বিভ্রান্ত তথাকথিত ওজনদার ব্যক্তিও বটে। এরা পরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের নির্যাসকে তরলীভূত ও দূষিত করে চলেছে। এমন হয়তো একটি সময়ের অপেক্ষায়, যখন ইতিহাসের ঐতিহ্য-ঐশ্বর্য-চেতনা কিংবা বিসর্জন কোনো কিছুই আর আদর্শ নিয়ে অক্ষত থাকবে না। সব একরঙা হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ, চেতনা, বিসর্জন সব হারিয়ে যাবে।

এরা যাদের নিয়ে মুক্তযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চর্চা করে, বলতে গেলে তাদের কারও সঙ্গেই বাঙালি ঐতিহ্যিক-ঐতিহাসিক কাল পর্ব তথা '৫২, '৫৪, '৫৭, '৬২, '৬৫, '৬৬, '৬৮-'৬৯ এমনকি রক্তঝরা '৭১-এর মার্চ বা মহান মুক্তিযুদ্ধেরও কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার সুযোগ নেই। এরা গাইতে গাইতেই গায়েন ও বাইতে বাইতে বায়েন হয়েছে। 

আপনি ইতিহাস খুঁজুন, এদের পাবেন না। ঐতিহ্য দেখুন এরা অদৃশ্য। ইতিহাসের বাঁক ও মোড় খুঁটে খুঁটে দেখুন, এদের অনুভূতির লেশমাত্র নেই। বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের শ্রেষ্ট বাঙালি মনোনয়ন দেওয়ায় এদের চটেছিল কেউ কেউ। ভিন্ন ও বিরূপ মন্তব্যও করতে ছাড়েনি। সাহসের অভাবে, অপকৌশলের কারণে ক্ষুব্ধ হতে পারেনি। এরা এক একটি পদকের জন্য অনেক খড়কুটো জ্বালিয়েছে, পুড়িয়েছে। বাতাস ও পরিবেশে দূষিত করেছে। 

এটি অত্যন্ত দূরদর্শী একটি সূক্ষ্ণ ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আগামী প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে, ইতিহাসের অবদান থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুনিপুণ প্রয়াস। কিশোর-তরুণ-যুবসমাজকে একবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপাদানগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন, বিভ্রান্ত, বিপন্ন করাতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে ভ্রান্ত পথে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পরিচালিত হবে। এটাই যেনবা, হয়তোবা প্রয়াস এই শ্রেণির।

বাংলাদেশের বিপন্ন ইতিহাসের বিশুদ্ধ চেতনা থেকে আদর্শকে, ঐতিহ্যকে বিচ্ছিন্ন করা এই প্রয়াসের সারকথা। 

এসব চক্রান্তকারীদের দুরভিসন্ধি থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বিস্ময়ের বাংলাদেশের প্রত্যয় দীপ্ত তারুণ্যকে, ভ্রান্ত সুশীলদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার আহ্বান জানাই।

এভাবে সূক্ষ্ণ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে, এর চেতনাকে, সার্বজনীনতাকে সাধারণীকরণ করে মুক্তিযুদ্ধের বিপর্যয় ঘটানো যাবে না, ভ্রান্ত প্রজন্ম তৈরি করা যাবে না।

এ দেশের কোটি তারুণ্যের প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের আহ্বান, বিভ্রান্ত না হয়ে ইতিহাস চর্চা করতে হবে। ইতিহাসের সঠিক বাঁক ও মোড় খোঁজে বের করে মননে তা চিরস্থায়ীভাবে ধারণ করতে হবে। আমাদের বিসর্জনের, অহংকারের, অস্তিত্বের ইতিহাসের ঐতিহ্য, ঐশ্বর্যগুলোকে অধ্যয়ন করে তার চর্চা নিরন্তর শানিত রাখতে হবে। আজ ও আগামী প্রজন্ম যাদের দ্বারা চালিত ও বাহিত হবে, তাদের জাগ্রত থাকা বেশি প্রয়োজন।