সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে জঙ্গি সংশ্নিষ্টতায় গ্রেপ্তারের খবর বেড়ে গেছে। পুলিশ ও র‌্যাবের গত এক মাসে বেশ কয়েকটি অভিযানের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, 'কিশোরগঞ্জের সেই চিকিৎসক জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা'। সেই চিকিৎসক মানে কিশোরগঞ্জের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. মির্জা নূর কাউসার। যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। শনিবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ শহরের খড়মপট্টি এলাকা থেকে তাঁকে 'তুলে নেওয়ার' অভিযোগ করে পরিবার। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা।

গত সপ্তাহে নতুন জঙ্গি সংগঠন 'জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়া'র দু'জন অর্থদাতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র‌্যাব। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একই সংগঠনের অর্থবিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক ও হিজরতবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় র‌্যাব। এর আগে ২০ অক্টোবর পাহাড়ে জঙ্গি সংগঠনের আরও সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ হয়। গত ১০ অক্টোবর নতুন জঙ্গি সংগঠন 'জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়া'র সদস্যদের পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বিচ্ছিন্ন সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে সেখানে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযানের খবর ঢাকায় র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

নতুন করে জঙ্গিবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো রাষ্টবিরোধী ষড়যন্ত্র, জনমনে ত্রাস, ভীতি ও জননিরাপত্তা বিপন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রশ্ন হলো, এর মাধ্যমে তারা আসলে কী অর্জন করতে চায়? ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদ সমাজের জন্য বিপদ। ধর্ম যেখানে সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা বলে, এর বাইরে গিয়ে উগ্রপন্থা ধর্মীয় অনুশাসন হয় কীভাবে? সমাজবিচ্ছিন্ন কিছু গোষ্ঠীর এ তৎপরতা তাদের নিজেদের যেমন কোনো উপকার করতে পারে না, তেমনি সমষ্টির জন্যও অকল্যাণকর।

সম্প্রতি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছে এমন ৫৫ তরুণের হালনাগাদ তালিকার কথা জানায় র‌্যাব। বিভিন্ন জেলা থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া এসব তরুণের অনেকের নাম-পরিচয় শনাক্ত করেছে র‌্যাব। সেদিন র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলি নামের এক নারী। জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ এই নারীকে 'ডি-রেডিকালাইজেশন' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে র‌্যাব স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। ইতোমধ্যে তাঁর ছেলেকে জঙ্গিবাদের পথে পাঠিয়ে তিনি যে ভুল করেছেন, তা সাংবাদিকদেরও জানান। ওই মা সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ছেলের উদ্দেশে যে বক্তব্য রাখেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, 'আব্বু, যদি তুমি আমার মেসেজ পেয়ে থাকো, বলতে চাই, তুমি চরম একটা ভুল পথে আছ। তুমি তোমার এই মাকে বিশ্বাস করতে পারো। তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি যদি কখনও তোমার এই মাকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে তুমি দেশের জন্য কোনো ধরনের হুমকির কাজ করবে না; কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নৃশংসতা, অন্যায় কাজে শামিল হবে না। আমি অনুরোধ করছি, তুমি আত্মসমর্পণ করো। প্রশাসন সদয় হবে।'

আমরা দেখেছি প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অনেকেই ফিরে এসেছে। বস্তুত, তাদের ফিরে আসাটা জরুরি। উগ্রবাদ কারও পথ হতে পারে না।