মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আজন্ম স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। শৈশবেই তিনি নিজের সল্ফ্ভ্রান্ত আর রক্ষণশীল পরিবারের বাধা ভেঙে সমাজের সাধারণ-মেহনতি মানুষের কাতারে চলে আসেন। অত্যাচারিত, দারিদ্র্যপীড়িত, খেটে খাওয়া মেহনতি মজলুম মানুষের জন্য হয়ে ওঠেন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। সমাজের অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বৈষম্যের উৎস আর তার সমাধান খুঁজতে গিয়েই এক পর্যায়ে তিনি আসামের আধ্যাত্মিক সাধক নাসিরউদ্দিন বোগদাদী (রহ.) এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁর সোহবতে আসাম গমন করেন। পরে দেওবন্দের বিপ্লবী আলেমদের সাহচর্যে ইসলামের বৈপ্লম্নবিক রাজনীতিতে দীক্ষা লাভ করেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জাতীয়তাবাদী দলের (পরে স্বরাজ্য পার্টি) সমর্থক হিসেবে তিনি রাজনীতিতে হাতেখড়ি রাখেন। যদিও ১৯১৯ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। কারাগারে তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানীদের। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি শুরু করেন ব্রিটিশবিরোধী প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রাম। এর পর ১৯২০ সালে খেলাফত আন্দোলন এবং ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ধূমকেতু হয়ে আবির্ভূত হন।

কিন্তু ১৯২৯ সাল থেকে আসামের নিপীড়িত বাঙালিদের অধিকার রক্ষায় মনোনিবেশ করতে গিয়ে তিনি আসামের প্রাদেশিক রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। শুরু করেন বিখ্যাত 'লাইন প্রথা' ও 'বাঙাল খেদা'বিরোধী আন্দোলন। হয়ে ওঠেন অত্রাঞ্চলের নিপীড়িত বাঙালির আশা-ভরসার মূর্ত প্রতীক। মূলত এই সময়েই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বাঙালি জাতিসত্তার অনুকূলে পৃথক একটি আবাসভূমি গড়ার। 

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেদিন জন্ম হয়, মওলানা ভাসানী সেদিন আসামের কারাগারে। স্বাধীন পাকিস্তানে ফিরেই তিনি ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইস্ট হাউসের দক্ষিণ দিকের মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় সর্বপ্রথম ভাষণ দেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলে ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মীদের বিদ্রোহী গ্রুপের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত প্রায় শ তিনেক প্রতিনিধির সম্মতিতে গঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক, যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। ২৪ জুন সদ্য গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় আরমানিটোলা মাঠে। সভায় সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী সরকারের ২২ মাসের অপকীর্তির খতিয়ান তুলে ধরে সবাইকে আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। একই বছর ১১ অক্টোবর আরমানিটোলা মাঠের আরেক জনসভায় তিনি খাদ্যসমস্যা সমাধানে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের ব্যর্থতার জন্য তাঁর পদত্যাগ দাবি করে বক্তব্য দেন এবং সভা শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করেন। ১৩ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি ২৪ ডিসেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে বিশাল জনসভা করেন। এর পর গ্রামেগঞ্জে অসংখ্য সভা-সমাবেশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ জনগণের কাছে তুলে ধরেন। এতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ক্ষমতার মসনদের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। 

১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন এবং একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনের ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে 'আসসালামু আলাইকুম' উচ্চারণ করে বলেন, 'যদি পূর্ব বাংলায় তোমরা তোমাদের শোষণ চালিয়ে যাও, যদি পূর্ব বাংলায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার স্বীকৃত না হয়, তাহলে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, তোমরা আমাদের কাছ থেকে একটি কথাই শুনে রাখ, আসসালামু আলাইকুম। তোমরা তোমাদের পথে যাও, আমরা আমাদের পথে যাব।' মওলানা ভাসানীর এই ঘোষণা সে সময়ের রাজনীতিতে মহা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীই সর্বপ্রথম পাকিস্তান সরকারকে 'আসসালামু আলাইকুম' জানিয়ে স্বাধীনতার পূর্ব ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনের পরই তিনি বৈদেশিক নীতি ও অন্যান্য বিষয়ে মতবিরোধের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর ২৫-২৬ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। একটি ব্রড বেজড পার্টি হিসেবে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। এ ছাড়া ৫৭'র ৩০ ডিসেম্বর ও ৫৮'র ১-৩ জানুয়ারি ফুলছড়ি ঘাটে এক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি 'পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি' গঠন করেন। ১৯৫৮ সালের ১৫ জুন প্রতিষ্ঠা করেন 'পূর্ব পাকিস্তান মৎস্যজীবী সমিতি'।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মারা যান প্রায় ১০ লাখ মানুষ এবং অগণিত পশুপাখি। মওলানা ভাসানী ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় খবর পেয়ে ১৬ নভেম্বর রাতের ট্রেনেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছান। ১৮ নভেম্বর হাতিয়া, ১৯ নভেম্বর রামগতি, ২০ নভেম্বর ভোলা এবং ২১ নভেম্বর বরিশালের বিভিন্ন এলাকা সফর শেষে ২৩ নভেম্বর পল্টনের জনসভায় তিনি ক্রোধে ফেটে পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের উদ্দেশ করে বলেন, 'ওরা কেউ আসেনি; আজ থেকে আমরা স্বাধীন; আমি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ।' কবি শামসুর রাহমান লিখলেন- 'হায় আজ একি মন্ত্র জপলেন মৌলানা ভাসানী।' ৩০ নভেম্বর তিনি 'পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী রক্ষা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ুন' শিরানামে এক প্রচারপত্র বিলি করেন এবং ৪ ডিসেম্বর পল্টনের জনসভায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একসঙ্গে থাকার যাবতীয় যৌক্তিকতা আগ্রাহ্য করে চূড়ান্ত দফা 'স্বাধীনতা' ঘোষণা করেন। বলেন, 'লাকুম দীনুকুম ওলিয়াদিন।' ১৯৭১ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সন্তোষ দরবার হলে 'স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় সম্মেলন' উপলক্ষে এক প্রতিনিধি সম্মেলনে দেশের ইতিহাস, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্নেষণ-পূর্বক স্বাধীনতার সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে জনগণ এখন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত বলে টানা ছয় ঘণ্টা বক্তৃতা করেন। ১২ জানুয়ারি ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলাকালে ভাসানী ১৩ জানুয়ারি নওগাঁয় এবং ১৮ জানুয়ারি রংপুরে জনসভা করেন। রংপুরের জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, 'যে কোনো হুমকিতে আমি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রাম থেকে বিরত হবো না।' ২০ জানুয়ারি গাইবান্ধায়, ২৬ জানুয়ারি চাঁদপুরের হবিগঞ্জে এবং ২৭ জানুয়ারি ফেনীর জনসভায় স্বাধীনতার দাবি পুনরুল্লেখ করে মুজিবকে উদ্দেশ করে ভাসানী বলেন, 'পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেয়ে তুমি বাংলার সিপাহসালার হও।' ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের এক বিশাল জনসভায় তিনি দেশবাসীকে স্বাধীনতার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সপ্তাহব্যাপী চট্টগ্রাম ও সিলেটে ছয়টি জনসভা করে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য জনসাধারণকে তৈরি হতে বলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় তিনি জনগণকে প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে ১৪ দফা দাবিনামা পেশ করেন। তার পর চূড়ান্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুজিবের আলোচনা আর ভাসানীর সভা, সমাবেশ, জ্বালাও- পোড়াও-ঘেরাও আন্দোলনের চাপ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর শুরু করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে এবং ৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর খোঁজে সন্তোষে প্রবেশ করে তাঁর বসতবাড়ি ও দরবার হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার পর সন্তোষে তাঁকে না পেয়ে ৬ এপ্রিল তারা মাইল দুয়েক পশ্চিমে বিন্যাফৈর গ্রাম আক্রমণ করে এবং স্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকে তাঁর বিন্যাফৈরের বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে তিনি বিন্যাফৈরের বাড়িতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের 'পরিকল্পনা নির্ধারণী সভা' করছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর কর্মীদের উদ্দেশ করে বলেন, 'জনবল আছে, শুধু অস্ত্র চাই।' সভা চলাকালেই তিনি হানাদারদের উপস্থিতি টের পান এবং গান পয়েন্টে এগিয়ে আসা হানাদার বাহিনীর ফাঁকফোকর গলিয়ে চাদর মুরি দিয়ে সরে পড়েন। ১৫-১৬ এপ্রিল ধলেশ্বরী-যমুনা হয়ে রৌমারীর নামাজের চর সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করলে তিনি এই সরকারকে সমর্থন দান করেন। তথাপি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দুই মাস বাঙালি নেতাদের মধ্যে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা, বিবৃতি, সাক্ষাৎকারই ভারতের পত্রপত্রিকায় সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। ২৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন, 'বর্তমান দুর্যোগের মুহূর্তে মানবজাতির কাছে বাংলাদেশের জ্বলন্ত প্রশ্ন : বর্বর পশুশক্তির কাছে কি ন্যায়সংগত মহান সংগ্রাম চিরতরে নিষ্পেষিত হবে?' বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান এবং গণহত্যা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে তারবার্তা পাঠান। যার মধ্যে ছিলেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই, রুশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিড ব্রেজনেভ, সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি ও প্রধানমন্ত্রী আলেস্কি কোসিগিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিপন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা'দাত, আরব লীগ সেক্রেটারি ডিলাল্লো তেলি প্রমুখ। সেসব তারবার্তা ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ছাপানো হয়। যেমন নিপনকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, 'আর অস্ত্র দেবেন না।' ১৬ মে আনন্দবাজার পত্রিকা 'ইয়াহিয়া খাঁকে ভাসানীর চ্যালেঞ্জ' শিরোনামে একটি বড় প্রতিবেদন ছাপায়। ৮ জুন আনন্দবাজার লেখে, 'লক্ষ প্রাণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা আসবে- মওলানা ভাসানী।' 'ঝড়াবৎবরমহ ইধহমষধফবংয রং :যব অরস্থ শিরোনামে দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরদের সতর্ক করে দেন। এ সময় লন্ডনের কিছু কিছু পত্রপত্রিকায় 'ভাসানী ভারত সরকার কর্তৃক নজরবন্দি' এরূপ খবর প্রকাশিত হলে তাঁর মুক্তির জন্য সেখানে গঠিত হতে থাকে বিভিন্ন সংগঠন ও কমিটি। জুন মাসেই তাঁর খোঁজে বারবারা হক লন্ডন থেকে ভারতে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না পেরে ফিরে গেলে গুজব আরও ডালপালা গজায়। এদিকে প্রবাসী সরকার গঠনের দুই মাস না যেতেই সরকারের নেতাদের মধ্যে উপদলীয় কোন্দল প্রকাশ্য রূপ লাভ করলে তাজউদ্দীন আহমদ মওলানা ভাসানীর শরণাপন্ন হন। মওলানা ভাসানীও তাঁর স্নেহভাজন তাজউদ্দীনের প্রতি সাড়া দিয়ে বলেন, 'তাজউদ্দীন সংগ্রামটা মিছিল, মিটিং, হরতাল আর প্রস্তাব পাশের না। অস্ত্র হাতে লড়াই, রক্ত-ঘাম, আগুন, জীবনবাজি আর কূটনীতির। ভেতরে-বাইরে হাঙরের হামলা, দোস্তের লেবাসের তলায় শানিত ছুরি, তুমি একলা পারবা?'- হুজুর তো আছেনই। আপনার দোয়া, পরামর্শ, সহযোগিতা সব সময়ই চাইব- তাজউদ্দীনের উত্তর।

১৯৭১ সালের ২৪ জুন এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, 'জীবনের সব সম্পদ হারিয়ে, নারীর ইজ্জত বিকিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে, দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এবং দশ লক্ষ অমূল্য প্রাণ দান করে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক মীমাংসার নামে ধোঁকাবাজি কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তাদের একমাত্র পণ হয় পূর্ণ স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু। এর মধ্যে গোঁজামিলের কোনো স্থান নাই।' এ সময় প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সিআইএর চক্রান্ত ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পাকিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একদলীয় যুদ্ধ বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণাকালে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বদলীয় চরিত্র দিতে ভাসানী-তাজউদ্দীনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় '৭১ এর ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকারের 'উপদেষ্টা পরিষদ' গঠিত হয়। আট সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী। কলকাতার হাজরা স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে মওলানা ভাসানী কোনো রকম আপস চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে 'সাত দফা' প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এর আগে ৩০-৩১ মে কলকাতার বেলাঘাটায় প্রবাসী বামপন্থি রাজনীতিবিদদের দু'দিনব্যপী এক সম্মেলন শেষে ১ জুন তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় 'বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি'। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নভেম্বর মাসে দেরাদুনে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারত সরকার তাঁকে 'অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস'-এ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে হাসপাতাল থেকে তাঁকে দিল্লির উপকণ্ঠে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফেরার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ২১ জানুয়ারি তিনি আসামের ফরিদগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণ দান শেষে ২২ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তার পর স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে মাটির ওপর খড়ের বিছানায় পরম তৃপ্তি নিয়ে প্রথম রাত্রি যাপন করেন।