বুধবার ঢাকার প্রথম যুগ্ম জজ আদালতের কার্যবিবরণীতে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না জি এম কাদের। জাতীয় পার্টি থেকে সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া জিয়াউল হকের করা মামলার শুনানি নিয়ে গত ৩০ অক্টোবর জি এম কাদেরের দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে ৮ নভেম্বর আদালতে আবেদন করেন জি এম কাদের। 

এর আগে জিয়াউল হক ৪ অক্টোবর জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈধ ঘোষণার ডিক্রি চেয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলায় দল থেকে জিয়াউল হকের বহিস্কারাদেশকে বেআইনি এবং দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০-এর উপধারা ১(১) অবৈধ ঘোষণার আবেদন জানানো হয়। মামলায় জি এম কাদের ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের সচিব, জাপার মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম দপ্তর সম্পাদককে বিবাদী করা হয়। জিয়াউল হক জাপার সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জি এম কাদেরের পক্ষে আদালতে বলা হয়েছে, জিয়াউল হককে আইন মেনে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। 

আমরা স্মরণ করতে পারি, বর্তমান সরকারের 'ভুলত্রুটি' নিয়ে বছরখানেক ধরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বক্তব্য এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আলোচনায় এনেছিল জাতীয় পার্টিকে (জাপা)। আদালতের এক অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ করেই যেন চুপসে দিয়েছে জি এম কাদেরকে। বিষয়টি আইনি হলেও এটি আসলে বিশেষ রাজনৈতিক 'বার্তা'। জাতীয় পার্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি সরকারের কৌশল হতে পারে। 

জাতীয় পার্টিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। চলতি সংসদের জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আর যোগ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। তবে শেষ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার আগেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। সংসদে যাওয়ার শর্ত ছিল- রওশন এরশাদের পরিবর্তে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে হবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে গেজেট প্রকাশ না করা পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে যাবেন না। রওশন এরশাদ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। মূলত তাঁকে হাতে রেখে জি এম কাদেরকে বাগে রাখতেই কি এই কৌশল? 

এখন দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে লড়াইয়ে সংসদের পর আদালতেও ধাক্কা খেয়েছে জি এম কাদের ও জাতীয় পার্টি। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না তিনি। আরও স্মরণ করা যেতে পারে, এরশাদ ও জি এম কাদের বর্জন করলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিএনপিবিহীন নির্বাচনে রওশনের নেতৃত্বে অংশ নেয় জাপার একাংশ। মূলত সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাংশের অংশগ্রহণ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে সহায়তা করেছিল। এ কারণে রওশনের প্রতি আওয়ামী লীগের সহানুভূতি ও সমর্থন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সে কারণেই কি জি এম কাদের জাপার ২৬ এমপির ২৪ জনের সমর্থন নিয়েও রওশনকে আড়াই মাসে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতে পারেননি? উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১ নভেম্বরের পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি জি এম কাদের। বক্তৃতা-বিবৃতিও দিচ্ছেন না।

আমরা জানি, প্রতিটি রাজনৈতিক দল চলে তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুসারে। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০-এর ১(ক) উপধারা অনুযায়ী দলীয় চেয়ারম্যান যে কাউকে দলে যে কোনো পদ দিতে পারেন। দল থেকে বহিস্কারও করতে পারেন। ২০১৯ সালের কাউন্সিলে এই গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়েছে। জি এম কাদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এখন আদালতে তাঁর দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলা করা আবার আদালতে এই মামলা অব্যাহত থাকা কী বার্তা দেয়?

বছরখানেক ধরে কড়া ভাষায় সরকারের সমালোচনা করছিলেন জি এম কাদের। একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছেন- আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর জোট নেই। জাপা আগামী নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে- এমন গুঞ্জনও রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

এই সময়ে জি এম কাদের দায়িত্ব পালনে যেভাবে 'অপারগ' হয়ে আছেন, তাতে দুটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, জাতীয় পার্টিকে আড়ালে থেকে কারা নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে? এভাবে আইনের বেড়াজালে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কে হবেন, তা নির্ধারণ করা স্বাধীন রাজনীতি চর্চার সঙ্গে মানানসই নয়। দ্বিতীয়ত, বর্তমান নিষেধাজ্ঞা জাতীয় পার্টি কীভাবে মোকাবিলা করবে? এই নিষোধাজ্ঞা কাটিয়ে জাতীয় পার্টি কি স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণহীন দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপসমূলক রাজনীতি চালিয়ে যাবে?