কয়েক দশক ধরে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চলছে অনির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে। এগুলোকে বলা যায় অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ। প্রথম ও শেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। এর পর থেকে যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের স্থানীয় নেতাদের এক ধরনের পুনর্বাসনের স্থান হয়ে পড়েছে এসব পরিষদ। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের আলোকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করে পরিষদগুলো। এসব পরিষদের নিয়োগের একটি বড় অংশ হলো প্রাথমিক শিক্ষক। অনেকে নানা অভিজ্ঞতা থেকে মজা করে এটিকে 'জ্বালা পরিষদ' বলে অভিহিত করেন।

পাহাড় সমাজে চাকরিপ্রার্থী যুবকসহ সচেতন মহলের মাঝে 'জ্বালা' শব্দের বহুল ব্যবহার নতুন কিছু নয়। পরিষদ পাহাড়ে কী উপকারে এসেছে এবং কোন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেটি এই লেখার আলোচ্য বিষয় নয়। তবে এটি গঠনের পর পরিষদ আয়োজিত নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেতে পাহাড়ে তরুণরা কী পরিমাণে তাদের পূর্বপুরুষের চাষযোগ্য জমি বা পাহাড় হাতবদল করেছে, তা একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে। খালি চোখে দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করলে জমি হাতবদলের পরিমাণ নেহাত কম হবে না। এ ছাড়া পরিষদের সদস্য হতে কতজন কী পরিমাণ সম্পত্তি হারিয়েছে এবং পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হয়ে কতটুকু সম্পত্তি অর্জন করতে পেরেছে, তাও একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।

এটি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা, পাহাড়ে তরুণদের বিশাল একটি অংশ জেলা পরিষদ কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। আরেক দল তরুণ- মূলত জাতীয় রাজনৈতিক দলের কর্মী- অপেক্ষা করে কখন নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠিত হবে। পাহাড়ে এই তিন জেলা পরিষদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আদিবাসীদের ভূমির নিবিড় সম্পর্ক আছে। সাদা চোখে এই পরিষদ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার জন্য গঠিত হলেও এখন নিয়োগ আর উন্নয়নের নামে মূলত রাস্তাঘাট আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিষদে পরিণত হয়েছে। পরিষদের কোনো গঠনমূলক উদ্যোগ বা মনে রাখার মতো কাজ দেখতে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। ফলে এই পরিষদ গঠনে আর নিয়োগে প্রার্থীরা যতটা আগ্রহী, গঠিত পরিষদের চেয়ারম্যান আর সদস্যদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা সেভাবে চোখে পড়ে না।

পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাস আর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিষদের সদস্য কিংবা চেয়ারম্যানরা কতটুকু স্থান পাবেন, সে কথা আমরা জোরগলায় বলতে পারি না। আমার মনে হয়, অধ্যাপক ড. মানিক লাল দেওয়ান আর গৌতম দেওয়ান ছাড়া অন্য কোনো চেয়ারম্যান বা সদস্য এ আলোচনায় স্থান পাবেন না। প্রতিটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদে একঝাঁক তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিয়োগ পেলেও সমাজে গঠনমূলক পরিবর্তন আনায় ভূমিকা রাখতে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে তাঁদের কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায় না। জেলা পরিষদগুলোকে দুর্গম পাড়ায় স্কুল চলল কি চলল না, শিক্ষক গেলেন কি গেলেন না, তা খোঁজ রাখতে দেখা যায় না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্গম গ্রামের স্কুল পরিদর্শনে পাঠাতেও দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পায়ে হেঁটে দুর্গম পাড়া স্কুল পরিদর্শন করতে যাওয়ার ঘোষণা দিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। পাকা সুন্দর সড়কের পাশে থাকা প্রাথমিক স্কুলগুলোয় ঘুরেফিরে সবাইকে পরিদর্শন করতে দেখা যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরত আদিবাসী তরুণদেরও দায়িত্ব বোধ থেকে পরিশ্রম করতে দেখা যায় না। ফলে পাহাড়ে একসময় শিক্ষা বিস্তারে যিনি (কৃষ্ণ কিশোর চাকমা) কাজ করেছিলেন, এখনও তিনিই একমাত্র উদাহরণ হয়ে রয়েছেন। নতুন উদাহরণ কোনো খাতে তৈরি হয়নি। একইভাবে আমার গ্রামের তরুণ মৌজাপ্রধানের কাছে প্রয়োজনে কাউকে যেতে হলে 'ব্রিজের তলায়' গিয়ে দেখা করে আসতে হয়। এটিও আমাদের জায়গাজমি হারানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

 ঢাকায় অনেক বছর ধরে থাকা হয় বলে উচ্চশিক্ষার নামে আজকাল যারা বিভিন্ন বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে, তাদের প্রতি আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ রয়েছে। রাজধানীর বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শ্রেণির ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করলেও গ্রাম থেকে কষ্ট করে উঠে আসা ছেলেমেয়ের তুলনায় পয়সাওয়ালা ছেলেমেয়েরা আরামপ্রিয় হয়ে মা-বাবার ওপর বাড়তি চাপ দিয়ে পড়ালেখা করে। অনেক মা-বাবা সন্তানের পড়ালেখার খরচ জোগাতে চাষযোগ্য জমি বিক্রি করেন। অনেকে ফলমূলের বাগান বিক্রি করেন। অবাক করার বিষয় হলো, এ অভিভাবকরা জানেনও না তাঁদের সন্তানরা কী করছে। জায়গাজমি, পয়সা আছে- এমন ছেলেমেয়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা দামের স্মার্টফোন ব্যবহার করে। লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ কিনে রুমে নাটক, টিকটক দেখার জন্য ফেলে রাখে। এমনও দেখেছি বাবা-মা জমি বিক্রি করে পড়ালেখার খরচ দিলেও ছেলেমেয়েরা হোস্টেল কিংবা মেসে না থেকে আলাদা বাসাবাড়ি নিয়ে এসি লাগিয়ে ঢাকায় পড়ালেখা করছে। শহরে এমন অনেককে পাওয়া যাবে, যারা একা একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। অন্যদের সাথে থাকতে নাকি তাদের সমস্যা হয়! 'বুং-বাং বিশ্ববিদ্যালয়ে' পড়ার জন্য পূর্বপুরুষদের ঘামে তৈরি করা প্রথম শ্রেণির জমি চলে যাচ্ছে।

পাহাড়ে আরেক শ্রেণির তরুণ পাওয়া যাবে, যারা নির্বাচনপাগল। নির্বাচন এলে প্রার্থী হতে পছন্দ করে। জায়গাজমি বিক্রি করে হলেও ভোটে তার পোস্টার থাকা চাই। পোস্টার লাগাতে গিয়ে নিজের জমি দিয়ে দেয়। নিজের না থাকলে ক্ষমতা ব্যবহার করে 'খাস জমি' খুঁজে বিক্রি করে। কাঠামোগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা নিত্যদিন নিজেদের জায়গাজমি হারানোর পাশাপাশি কিছু তরুণের জেলা পরিষদে পদ-পদবি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, জেলা পরিষদের চাকরিপ্রার্থীসহ অতি স্মার্ট অদূরদর্শী ছাত্রছাত্রীদের জন্যও আমাদের পিতৃভূমি দিনকে দিন হারিয়ে ফেলছি।

উল্লিখিত শ্রেণির যুবক আমায় বলতে পারে- আমরা আমাদের জায়গাজমি বিক্রি করব, তাতে তোমার কী? তোমার এত মাথা খারাপ কেন? আমি বলব, তোমার/আপনার জায়গা না থাকা মানে আমারও না থাকা। পাহাড়ে খুব কম লোকের হাতে জায়গাজমি আছে। যাদের জায়গাজমি আছে, তাদের ছায়ায় অনেক লোক বাঁচে। আমাদের গ্রামে অন্তত কিছু জায়গাজমি আছে বলে শিশু-কিশোররা সেখানে খেলা করতে পারে। যাদের গরু আছে চড়াতে পারে। যারা পশু-পাখি লালন-পালন করে, ছেড়ে রাখতে পারে। চাষযোগ্য জমির বর্গা, ভাগা কিংবা অর্থের বিনিময়ে হলেও চাষ করতে পারে। আমরা যদি বিক্রি করে দিই, তাদের সে সুযোগ হারাতে হবে। তারা দূর পাহাড়ে চলে যাবে। তারা চলে গেলে আমাকেও ভাবতে হবে।

জায়গাজমি বিক্রি করে শহরে পড়ালেখা করায় দোষের কিছু দেখি না। আমার বক্তব্য হলো, ডিজিটাল যুগের স্মার্ট তরুণরা একটু সচেতন হলে মা-বাবার কষ্ট লাঘব হবে। বাপ-দাদার ভিটা, চাষযোগ্য জমি, পাহাড়, ফলের বাগান রক্ষা পাবে। ঢাকায় যেনতেন একটি কলেজে পড়ার জন্য মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি পড়ালেখা করতে গিয়ে মা-বাবাকে এতটা কষ্ট দিইনি। আলাদা বাসা ভাড়া, লেটেস্ট মডেলের ল্যাপটপ চাইনি। এমআইটি, হার্ভার্ড, অপফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য যদি জমি বিক্রি করতে হয় করব। তাই বলে ঢাকা শহরে যেখানে সেখানে অলিগলিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য ৬০ হাজার টাকা দামের মোবাইল, ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দামের ল্যাপটপ, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বা একা আলাদা বাসা ভাড়া থাকার জন্য পাহাড়ের জমি বিক্রি করতে দেখলে তা মন থেকে মেনে নিতে পারি না।

স্মার্ট তরুণকে বলব একটু চোখ খুলে তাকাতে। দেখবে যেখানে পড়ছো, সেখানে জুমচাষি, দিনমজুরের ছেলেমেয়েরাও পড়ালেখা করছে। তারা কিন্তু তাদের মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়ার বদলে মা-বাবার দুঃখ লাঘবে লেখাপড়ার পাশাপাশি নানা কাজ করে সহযোগিতা করছে। প্রথম উপার্জন করা টাকা দিয়ে মা-বাবাকে বিমানে চড়াচ্ছে। আমার চোখে তারাই বরং স্মার্ট তরুণ। পাহাড়ে এমন তরুণই দরকার।