সাম্প্রতিকতম দুই বছরের বেশি সময় করোনাভাইরাস মহামারি মৃত্যুর লু হাওয়ায় সারাবিশ্বকে তছনছ করে এখনও সম্পূর্ণ বিদায় নেয়নি। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অতিমারির অবসান ঘোষণা না করলেও অপদানবের দাঁতের কামড় আর নেই, বহুলাংশে পৃথিবীতে সুস্থ জীবনধারা ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক সভা-সম্মেলন ও উৎসবগুলো হচ্ছে। কারণ, মানবজাতি এখন পর্যন্ত অপরাজেয়। বিজ্ঞান তার আয়ুধ।

কিন্তু মানবজাতি অশান্ত ও অস্থিরও। অতিমারি শেষ হতে না হতেই রাশিয়া তার প্রতিবেশী, এককালের একই রাষ্ট্রের অংশ, বর্তমানে পৃথক স্বাধীন দেশ ইউক্রেনকে ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের কারণে আক্রমণ করে যুদ্ধ বাধিয়ে বসেছে। এ যুদ্ধের ফলে করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মুহূর্তে আবার বিপদে পড়ে নতুন বৈশ্বিক সংকট ডেকে এনেছে। অনেক দেশের সঙ্গে এর শিকার বাংলাদেশও। বড় দেশগুলোর রাজনীতিবিদরা আবার প্রমাণ করলেন যে, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ মেটাতে অক্ষম অথবা অনিচ্ছুক। কোটি কোটি মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট ডেকে আনতে তাঁরা দ্বিধা করেন না।

আবার মানুষেরই আরেক রূপ যে, এই ক্রান্তিকালে এক মরুর দেশের প্রাকৃতিক লু হাওয়াকে বশে এনে, স্টেডিয়ামগুলো পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করে আজ থেকে শুরু হচ্ছে এক বৈশ্বিক উৎসব। এক মাসব্যাপী। আরব উপসাগরীয় দেশটির নাম কাতার। আর উৎসবের নাম ফুটবল বিশ্বকাপ, ২০২২। বিশ্বের সাত মহাদেশের ছয়টির ৩২টি দেশের জাতীয় ফুটবল টিম ৮টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে খেলবে মোট ৬৪টি ম্যাচ এবং শেষে একটি টিম চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনার কাপ নিয়ে ঘরে যাবে।

ফুটবল এমন এক খেলা যে, অ্যান্টার্কটিকায় যদি মানুষ থাকত তাহলে সেখানেও এই খেলা হতো। সব খেলা সব দেশ খেলে না। আরেকটি আন্তর্জাতিক খেলা ক্রিকেট খেলে মাত্র ২৪টি দেশ এবং আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মাঠে হাজির দেশ মাত্র ১২টি। আমরা বাংলাদেশ তার একটি।

বিশ্বকাপ এমন এক উৎসব, যা সারাবিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে। এমনকি যুদ্ধরত দেশগুলোরও সব মানুষের হৃদয়তন্ত্রী একই সঙ্গে একই তালে-লয়ে ঝংকৃৃত হবে ফুটবলবীণার সুরে। চার বছর পরপর পৃথিবীর বিভিন্ন গোলার্ধের বিভিন্ন দেশে বিশ্বকাপের আসর বসে বলে ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে মানুষকে সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যায় বা গভীর রাতে, শেষরাতে ঘুম ঘুম চোখেও টেলিভিশনে খেলা দেখতে হয়। সারা পৃথিবীর মানুষকে একই সময় একই সঙ্গে জাগিয়ে রাখে আর কোন্‌ ঘটনা? ৫৭ হাজার ৬০০ বর্গফুটের মাঠে ২২ খেলোয়াড়ের ৯০ মিনিট অবিরাম ছোটাছুটি, একটি গোলক নিয়ে ড্রিবলিং, ট্যাকলিং, পাস, শট, কিক, গোল দেওয়ার প্রতিযোগিতা, দর্শকের উচ্ছ্বাস, সমর্থকদের এই উল্লাসের জয়ধ্বনি তো এই আক্ষেপের হুতাশে হৃদয়াবেগ উথলে ওঠে আর কোন খেলায়?

ক্রিকেটের মতো ফুটবল বাঙালির নিজস্ব খেলা না হয়েও, ইউরোপ থেকে এসেও হয়ে গেছে আমাদের ক্রীড়া-সংস্কৃতির অঙ্গ। এমনকি পরোক্ষ রাজনৈতিক ভূমিকাও রেখেছে। অবিভক্ত ভারতে বিশ শতকের প্রারম্ভে বাঙালির ক্লাব ইউরোপীয় ক্লাবের বিরুদ্ধে জিতলে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী জয়ের উল্লাসধ্বনি ওঠে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ঐতিহাসিক স্বাক্ষর রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যমঞ্চে বাংলাদেশের স্থান আছে। এ আমাদের গৌরব। ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চের সিঁড়ির নিম্নধাপেও আমরা নেই। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দল বা তারকা মেসি-রোনালদো-নেইমারকে নিয়ে সমর্থকদের নানা রকম উন্মাদনা ও মাতামাতি ওইসব দেশের রাষ্ট্রদূত এবং বিশ্ব মিডিয়ার সবিস্ময় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একদিন হয়তো আমরা বিশ্বমঞ্চে ফুটবল খেলব এবং এই আবেগ সংযত হয়ে পরিশীলিত সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটাবে। আমাদের মেয়ে ফুটবলাররা দক্ষিণ এশীয় পরিমণ্ডলে ছাপ রেখে ওই সোনালি ইশারা দিয়েছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল মানবজাতির বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ। সব দেশের সব জাতির মানুষের মধ্যে স্বার্থগন্ধহীন পবিত্র আনন্দ, উপভোগ, বিনোদন ও আবেগের এই বিপুল তরঙ্গ ভবিষ্যতে বিশ্বমানবকে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক-মানবিক সর্বাঙ্গীণ অর্থে ঐক্যবদ্ধ করুক- এই আশা নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের পর্দা উন্মোচনকে আমরা উদযাপন করি।