বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় কাতার। এ বছরের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করতে কাতার যে বিস্ময় জাগিয়েছে, তা সমীহ করার মতো বৈকি। কাতারের বিরুদ্ধে যখন ইউরোপ কথা বলছে, দেশটির হয়ে খোদ ফিফা প্রেসিডেন্ট তার জবাব দিচ্ছে। এমন জবাব যেটি পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো কল্পনাও করেনি! বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব কাতারের সমালোচনা করে আসছে। গরম আবহাওয়া থেকে শুরু করে মানবাধিকার রেকর্ড, অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে আচরণ এবং সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরার মতো বিষয় নিয়ে যখন সমালোচনা হচ্ছে তখন বিস্ম্ফোরক এক মন্তব্য করেছেন ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি বলেছেন, 'আমি ইউরোপীয়। আমরা বিশ্বজুড়ে তিন হাজার বছর ধরে যা করছি, নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার আগে আগামী তিন হাজার বছর আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।'

মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করতে খরচ করেছে ২২০ বিলিয়ন ডলার বা ২৩ ট্রিলিয়ন টাকা। এর আগে কোনো দেশই ১৫ বিলিয়ন ডলারে বেশি খরচ করেনি। অথচ কাতার সেটি করেছে। তেলসমৃদ্ধ দেশটি বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে নতুন স্টেডিয়াম বানিয়েছে সাতটি। বাংলাদেশের মতো কাতারও ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছে। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে ধনী দেশ কাতার। ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে কোনো কিছুর কমতি করেনি দেশটি। ফুটবল বিশ্বকাপ যেখানে সাধারণত জুন-জুলাইয়ে আয়োজন হয় সেখানে কাতারের গরমের কথা ভেবে, এবার আয়োজন হচ্ছে নভেম্বর-ডিসেম্বরে। তারপরও কাতার স্টেডিয়ামগুলোকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিসেবেই তৈরি করেছে।

কাতারে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের ২২তম আসরে ৩২ দলের আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ না থাকলেও চার হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও এখানকার ফুটবল সমর্থকরা তার উত্তাপ পাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি বিশ্বকাপের মতো এবারও নিজ নিজ দলের পক্ষে সমর্থন দেখাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে ও বাইরে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে মানুষের মাতামাতি বেশি। সে কথাই বলছে, সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি লেখা- ইন বাংলাদেশ, দ্য আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সকার রিভালরি ইজ কিউরিয়াস 'ফ্রেনজি'। তবে কাতারের বিশ্বকাপে এবার বাংলাদেশের অংশগ্রহণ পরোক্ষভাবে হয়েছে, আমাদের শ্রমিকরা সেখানকার স্টেডিয়ামসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে কাজ করেছে। 

ফুটবল বিশ্বকাপকেন্দ্রিক খরচের বহর দেখে অনেকে হয়তো কাতারের জন্য আফসোস করবেন। কিন্তু এটিও বলা দরকার 'কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০'-এর আওতায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ আগেই শুরু করেছিল দেশটি। বিশ্বকাপের আয়োজন করতে গিয়ে তাদের সেই ভিশন এর অনেক কিছু আগেই দেশটি বাস্তবায়ন করছে। নতুন মেট্রোরেল চালু, বিমানবন্দর, সড়ক, নতুন হোটেল ও অবকাশ যাপনের সুবিধাদিও তারা সে লক্ষ্যেই তৈরি করেছে। এমনকি বিশ্বকাপ উপলক্ষে যে স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোও খেলার পর মার্কেট বানানোসহ অন্য কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা দেশটি।

বিশাল ফুটবলের আয়োজন ছোট্ট কাতার সফলভাবে সম্পন্ন করে কাতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, সেজন্য দেশটিকে নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ প্রাপ্য। কাতার তার মূল্যবোধের জায়গা থেকেও যেখানে কঠোর হওয়ার কথা সেখানে কঠোর হয়েছে; ছাড়ও নিশ্চয়ই দিতে হয়েছে। তারপরও কাতার নিজেদের প্রমাণ করেছে। এর মাধ্যমে নিজেরা চুপ থেকেও অন্তত পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনারও যে কড়া জবাব দিচ্ছে, তা ফিফা সভাপতির বক্তব্যেই স্পষ্ট। এরসঙ্গে কাতার 'টিম' যদি ভালো খেলা দেখাতে পারে, সোনায় সোহাগা।