মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। সম্প্রতি মারা গেলেন গায়ক আকবর আলী গাজী। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা ঠিকমতো হয়নি। সুসময়ে কত বড় বড় মানুষ আকবরকে মাথায় তুলেছে! দুঃসময়ে তারা নেই। যখন আকবরের দরাজ গলায় জোর ছিল, তখন তাঁর সঙ্গে জানা-অজানা কত মানুষই না ছিল। তাদের সময় দিতে দিতে পরিবারকেও হয়তো সময় দিতে পারেননি মানুষটা। অথচ দুঃসময়ে পরিবার তাঁর সঙ্গে ছিল। খুব দুঃখ করে আকবর তার আদরের টুকরা মেয়েটার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, 'এটা শেষ দিয়ে গেলাম আর কোনোদিন দেব না; রাস্তায় ভাসিয়ে দিয়ে গেলাম, আমি আর বাঁচব না।' বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আপনজনের টানে মানুষের বাঁচবার আকুতিটা এভাবেই বুঝি একদিন মরে যায়। আহা, আহারে জীবন। 

'এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'- কিংবদন্তি এই কবির চোখে পানি দেখে মনটা কেঁদে উঠল। সব উজাড় করে দিয়েছেন মানুষকে, অথচ এই গুণী মানুষটার দায়িত্ব নেওয়ার আজ কেউ নেই। অথচ আত্মজীবনী ও আরও কবিতা লেখার আকুতি মানুষটার অন্তরে। হয়তো পুড়ছে, পোড়াচ্ছে তাঁকে। স্বার্থপর মানুষ তাঁর কাছ থেকে নিয়েছে অনেক; কিন্তু দেওয়ার সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সবাই। হায়, হায়রে জীবন! সত্যি আমরা দুর্ভাগা জাতি। সময় থাকতে মানুষের মূল্য বুঝি না; আগাছা, পরগাছা, পরজীবীদের মূল্য বুঝি; চোর, বাটপার, প্রতারক, লোভীদের মূল্য বুঝি।

মানুষ সফলতার পূজারি হয়। কেউ সফল হলে মানুষের চোখে সে আর মানুষ থাকে না; নায়ক হয়ে যায়। তারপর ক্রমান্বয়ে নায়ক থেকে মহানায়কে পরিণত হয়। পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ এক চোখ দিয়ে দেখে। পৃথিবীতে সফল মানুষের সংখ্যা খুব কম হয়, বেশিরভাগ মানুষ সফলতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। তবে সফলদের সফলতার পেছনে ব্যর্থ মানুষদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান থাকে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, আমরা যাদের সফল বলে মাথায় তুলি, তাদের বেশিরভাগ মানুষ সুখী নয়। বরং যাদের ব্যর্থ হিসেবে চিন্তা করি, তাদের বেশিরভাগ মানুষ সুখী। ব্যর্থরা বাস্তব পৃথিবীর নায়ক, মহানায়ক হয়। সফল মানুষরা সাজানো পৃথিবীর নায়ক, মহানায়ক হয়। তবে ব্যতিক্রম তো আছেই, ব্যতিক্রম কখনও নিয়ম মানে না। 

একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একটা ছেলে এখনও বেকার। আমাদের মতো সমাজে সে ছেলেটার কোনো দাম নেই। পরিবার থেকে সমাজ- সবাই তাকে উঠতে-বসতে ভর্ৎসনা করছে। তাকে একটু হাত ধরে উপরে উঠানোর মতো উদারতা কেউ দেখাতে না পারলেও তার ব্যর্থতার দিকে বারবার আঙুল তুলছে। একটা ভেঙে পড়া মানুষকে আরও ভাঙছে, শুকুনির মতো তার মনের ভেতরটাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। 

অথচ যদি গভীরভাবে বিষয়টা ভাবা হয়, তবে এটা খুব পরিস্কার- তার বেকারত্বের দায় তার নয়, এই দায় সমাজের- এই লুকানো সত্যটা সবাই কেমন যেন জেনেও ভুলতে বসেছে। স্বার্থপর মানুষ তার দুর্বলতাকে সব সময় এড়িয়ে গিয়ে দুর্বলদের ওপর তার ক্ষমতার দাপট দেখায়, এই মনস্তত্ত্বটা অনেকটা এমন। 

একটা চাকরির সাক্ষাৎকারে বেকার মানুষটা ব্যর্থ হয় বলেই সফল মানুষ তৈরি হয়। আমাদের সমাজে চাকরি পাওয়া মানুষেরা সফল বলে গণ্য হয়, চাকরি পেতে ব্যর্থ হওয়া মানুষেরা বিফল বলে গণ্য হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যোগ্যতা সবার থাকলেও আমরা সবার জন্য চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। সে অর্থে বেকার মানুষেরা ব্যর্থ নয়, ব্যর্থ হচ্ছে এই ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা। যেটা সত্য জেনেও আমরা মানতে চাই না, বরং অনেক যুক্তি ও বিকল্প দাঁড় করাই। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় সফলদের জন্য যখন অভিনন্দনের ছড়াছড়ি, তখন ব্যর্থদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। সবাই সফলদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও ভুলে যায় সেই চাকরি না পাওয়া ছেলেগুলোর লড়াইকে। একজন মানুষও সান্ত্বনার ছলে হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের উদ্দেশ করে বলে না- এবার হয়নি তো কী হয়েছে, সামনে হবে; হয়তো অনেক বড় কিছুই হবে। ভেঙে পড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিও না, বরং ঘুরে দাঁড়াও; পৃথিবীকে চিনিয়ে দাও তোমার অদম্য সাহসকে। 

আসলে মানুষ খুব কাপুরুষ হয়, সংকীর্ণ হয়, নিজের বড়ত্বকে মানুষের সামনে আনতে ভয় পায়। সবাই যেভাবে ভাবে, মানুষ সেভাবে ভাবতে ভালোবাসে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ভাবতে গিয়ে রিস্ক নেওয়ার মতো সাহস দেখাতে পারে না।

যে সমাজে ভালো মানুষেরা নিগৃহীত হয়, পদে পদে অপমানিত হয়, লাঞ্ছিত হয়, সে সমাজে ভালো মানুষরা ক্রমাগত আড়ালে চলে যায়। মিথ্যা একটা মোহ, মিথ্যার প্রতি মানুষের একটা আকর্ষণ থাকে, অথচ এই মিথ্যাই মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। সত্যকে মানুষ উপহাস করে, সত্যকে বন্দি করে রাখে অথচ সত্যই সভ্যতা গড়ে তোলে।