আগামী ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ঢাকায় গণসমাবেশ করতে চায়। এই সমাবেশের জন্য দলটি স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের জায়গা। এর আগেও দলটি এখানে বহু সমাবেশ-মহাসমাবেশ করেছে। এমনকি দলটির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশও এখানে হয়েছিল। সেইসব সমাবেশে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও অংশ নিয়েছেন। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ নয়াপল্টনে হয়ে থাকে- এটা প্রায় নিয়মিত চিত্র। তবে এবার দলটির ঘোষিত ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি এসেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। পাশাপাশি ঢাকা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাদের পছন্দের ভেনুর পরিবর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বিএনপির জন্য বরাদ্দ দিতে চায়। সমাবেশের অন্তত ১০ দিন আগেই তাই বিএনপির সমাবেশ ঘিরে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে- বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাঠাতে কেন মরিয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ? আর বিএনপি কেন নয়াপল্টনে সমাবেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি কেন যেতে যায় না, তার ব্যাখ্যা আমরা পেয়েছি। সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সেই ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের ভাষণ বিএনপির পছন্দ না-ও হতে পারে। যদিও জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে সর্বকালের অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে।
আওয়ামী লীগের এই নেতার বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে জুতসই। কিন্তু খানিক খেয়াল করলেই এ বক্তব্যের চাতুরি ধরা কঠিন কিছু নয়। বিএনপি ঢাকায় সমাবেশের আগে অন্তত আটটি গণসমাবেশ করেছে। সেসব সমাবেশের আগে পাতানো পরিবহন ধর্মঘট থেকে শুরু করে সরকারদলীয় লোকদের ভয়ভীতি, পুলিশের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি, পছন্দের জায়গা বরাদ্দ না দেওয়া এবং সমাবেশের দিন সংশ্নিষ্ট জেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল করে নিয়ন্ত্রিত রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে। তার পরেও সমাবেশে উপস্থিতি নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমে যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা এই সাক্ষ্য দেয় না যে বিএনপির সমাবেশে লোকজনের উপস্থিতি কম।

বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ ঘিরে আরেকটি বিষয় নজরকাড়ার মতো। পুলিশ সমাবেশের জন্য একটি শর্ত দিয়েছে। বলা হয়েছে, সমাবেশ করতে হলে এই শর্ত মানতে হবে। ২৬টি শর্তের দীর্ঘ তালিকা পাঠে মনে হতে পারে- এসব শর্ত মানলে এটিকে আর সমাবেশ বলা যাবে কিনা! ২৬টি শর্ত উল্লেখ না করে কেবল প্রথম এবং শেষ শর্তটির দিকে তাকাই। প্রথম শর্ত হচ্ছে- এই অনুমতিপত্র স্থান ব্যবহারের অনুমতি নয়; স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।' শেষ শর্ত হলো- 'জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে এই অনুমতি আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।' আরও দু-একটি শর্ত আমরা উল্লেখ করতে পারি- সমাবেশ শুরুর ২ (দুই) ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে; সমাবেশস্থলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে; স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করে সমাবেশ পরিচালনা করতে হবে।

আমরা স্মরণ করতে পারি, ইতোমধ্যে যে আট জায়গায় সমাবেশ হয়েছে, তার মধ্যে কুমিল্লা (সমাবেশ হয়েছে ২৬ নভেম্বর) ছাড়া বাকি সাত জায়গায় জেলা প্রশাসন বা পুলিশের লিখিত কোনো শর্ত সেভাবে ছিল না। সমাবেশস্থলে লাঠি নেওয়া যাবে না এবং সন্ধ্যার আগে সমাবেশ শেষ করতে হবে- এই দুই শর্ত মৌখিকভাবে সব জায়গাতেই ছিল। আমরা আরও স্মরণ করতে পারি, সম্প্রতি ঢাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের সমাবেশ হয়েছে। সেই সমাবেশে লোকজন হাজির করতে বরিশাল থেকে লঞ্চ ভাড়া করা হয়েছিল। বিএনপির সমাবেশে পরিবহন বন্ধ রাখার বিপরীতে লঞ্চ ভাড়ার দৃশ্য এবং ঢাকার ১০ ডিসেম্বর ঘিরে পুলিশের দীর্ঘ শর্তের তালিকা আসলে বর্তমান রাজনীতির আসল চিত্রই প্রকাশ করছে।

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশগুলোয় উপস্থিত হওয়া নেতাকর্মী বাড়িতে ফেরার সময় হামলার কথা জানা গেছে। সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের হামলায় অনেকে আহত হয়েছেন। বরিশালে হামলায় বিএনপি নেতা ও সাবেক এক সংসদ সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাই বিএনপি নানা কারণেই সমাবেশ করার ক্ষেত্রে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে অনিরাপদ ভাবতে পারে। অন্যান্য সমাবেশে স্থান বরাদ্দ পেতে সিদ্ধান্তহীনতা থাকলেও এখন ১১ দিন আগেই সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে পুলিশের লিখিত অনুমতিকে সন্দেহজনক মনে করলে অস্বাভাবিক হবে না। গত ১৫ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে নয়াপল্টনে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে ডিএমপির কাছে আবেদন করেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী। ওই দিনই দলটির পক্ষ থেকে কয়েকজন নেতা ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে সমাবেশ করার বিষয়ে জানান।

ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ মিলে বিএনপিকে পছন্দের জায়গা নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে না দেওয়ার ঘোষণায় বিএনপিও নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে নিতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অত্যুৎসাহী হওয়াটা বিএনপি নেতাদের মনে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। যখন ঢাকার সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে করতে দেওয়া হবে বলা হচ্ছে, ঠিক তখনই বিএনপির ৩ ডিসেম্বরের রাজশাহী সমাবেশ ঘিরে আটটি জেলায় পরিবহন ধর্মঘট চলছে। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে ক্ষমতাসীনদের যে কোনো দুষ্ট পরিকল্পনা নেই- এমন নিশ্চয়তা কেউ কি দিতে পারেন?

এহ্‌সান মাহমুদ: সহ-সম্পাদক, সমকাল