ঝুরঝুরে মাটি। সার দিলেও এখন আর ভালো ফলন হয় না- বগুড়ার শিবগঞ্জের চাষি হানিফ মিয়া আক্ষেপ নিয়েই বলছিলেন এমন কথা। হানিফের বেগুন ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে মিলল এর সত্যতা। বেগুন গাছের পাতা হলুদ-ফ্যাকাশে আর অসংখ্য ছিটে দাগ। শুধু শিবগঞ্জের জমিই নয়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার ফসলের মাঠেই এখন 'মাটির কান্না'। জমির মাটি হয়ে গেছে বিবর্ণ, অনুর্বর।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও সংবেদনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের কারণে মরে যাচ্ছে মাটি। স্বাভাবিক কারণেই ভয়ংকর ঝুঁকিতে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের কৃষিজমি। বাড়ছে মাটির অম্লত্ব (এসিডিটি)। অনেক স্থানের মাটি হয়ে যাচ্ছে বন্ধ্যা (ফসল ফলে না)। গবেষণাগারে পরীক্ষা করে মাটির সাধারণ জৈবিক গুণাবলিও ভালো পাওয়া যাচ্ছে না। এখনই সাবধান না হলে অদূর ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদনে বড় ধাক্কা খাবে এই অঞ্চলের কৃষি।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, উত্তরাঞ্চলের ফসল উৎপাদনে কৃষকদের অন্যতম সমস্যা হলো মাটির অম্লত্ব। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ জেলার মাটি অম্লীয়। এ কারণে মেলে না কাঙ্ক্ষিত ফলন। মাটির অম্লত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাইট্রোজেন, পটাশ ও মলিবডেনামের দ্রবণীয়তা কমে যায়। এ ছাড়া ফসফরাস, জিঙ্কসহ অনেক পুষ্টি উপাদান মাটির সঙ্গে আঁকড়ে থাকার কারণে গাছের জন্য খাবার দিলেও তার সুফল পাওয়া হয় না।

যেভাবে এলো রাসায়নিক সারের ব্যবহার :পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত দেশের চাষ ব্যবস্থা ছিল জৈবসারনির্ভর। ১৯৫৫ সালে মাটির শরীরে পুষ্টি ঘাটতি দেখা দিলে প্রথম জমিতে ব্যবহার করা হয় অ্যামোনিয়াম সালফেট। ১৯৫৯ সালে 'অধিক খাদ্য ফলাও' কর্মসূচির সবুজ বিপ্লব শুরু হলে ব্যবহার শুরু হয় ইউরিয়া সারের। ষাটের দশকে মাটির ফসফেট ঘাটতি পূরণের জন্য ট্রিপল

সুপার ফসফেট (টিএসপি) দেওয়া হয়। সত্তর দশকের মাঝামাঝি এমওপি বা পটাশ সারের ব্যবহার শুরু হয়। নব্বই দশকে নতুন সমস্যা হিসেবে সামনে আসে মাটিতে সালফারের ঘাটতি। তখন দরকার পড়ে জিপসাম সারের। এরপর ধরা পড়ল মাটিতে দস্তা সংকট। ব্যবহার শুরু হলো দস্তার। ২০০০ সালে মাটি পরীক্ষায় ধরা পড়ে, মাটিতে বোরন ও মলিবডেনাম নেই। যুক্ত হলো আরও দুই রাসায়নিক। এরপর আরও নানা নামে বিভিন্ন রাসায়নিক এসেছে। কৃষিজমির অবক্ষয় নিয়ে ২০০০ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন থেকে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। পরে ২০২১ সালে আরেকটি গবেষণা চালালে দেখা যায়, পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

যে কারণে ঝুঁকিতে মাটি :সম্প্রতি মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে জানা যায়, মাটিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সিলিকন ও কপার নেই। এ দুই পুষ্টি উপাদান মাটিতে কম থাকলে ভালো ফলন হবে না- এটিই স্বাভাবিক। মাটির পুষ্টি ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো জৈব পদার্থ। মৃত্তিকাবিজ্ঞানীদের মতে, মাটিতে অন্তত ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা দরকার। অথচ উত্তরাঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি এখন ১ শতাংশেরও কম। এ অবস্থায় ফলন বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় স্থায়ীভাবে মাটি হারিয়ে ফেলছে উর্বরাশক্তি। ঘাটতি পূরণের জন্য যেসব রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ভেজাল।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট বিভিন্ন সারের ৪ হাজার ৯০০ নমুনা পরীক্ষা করে যা পেয়েছে, তা রীতিমতো ভীতিকর। দেখা গেছে, ফসফরাস সারে ভেজাল ২০ শতাংশ, দস্তায় ৭১ শতাংশ, পটাশে ২৬ শতাংশ, বোরনে ৭১ শতাংশ, মিশ্র সারে ৭৭ শতাংশ, এসএসপি সারে ৭৫ শতাংশ এবং জিপসাম সারে ভেজাল রয়েছে ৪৫ শতাংশ।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তৎপরতা :বগুড়া আঞ্চলিক গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, যে মাটিতে যত বেশি জৈব পদার্থ থাকে, সে মাটি ততই সমৃদ্ধ। গাছের জন্য যত ধরনের খাদ্য উপাদান প্রয়োজন, প্রায় সবই কমবেশি থাকে এ জৈব পদার্থে। তা ছাড়া মাটির ভৌত রাসায়নিক ও অণুজৈবিক প্রক্রিয়া জৈব পদার্থের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং জৈব পদার্থের ব্যবহার বাড়ানো খুবই জরুরি।

কৃষকদের জমি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ কৃষক অপরিকল্পিতভাবে সার দেন। কেউ অতিমাত্রায় দেন, আবার কেউ দেন অল্পমাত্রায়। ফলে ফসল স্বাভাবিকভাবে বাড়ে না। গাছের ওপর অতিমাত্রা বা অল্পমাত্রা দুটিই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

সমাধান হিসেবে তাঁরা বলছেন, চাষাবাদের আগেই কৃষকের প্রথম কাজ হলো মাটি পরীক্ষা করা, পরে পরামর্শ অনুযায়ী সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, খরচও কম হবে। ফলন বাড়বে ১৫-২০ শতাংশ।

বড় বাধা টপ সয়েল :উত্তরাঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে কৃষিজমির উপরিস্তরের মাটি (টপ সয়েল) অন্যত্র স্থানান্তরিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইটভাটায় যাচ্ছে এসব মাটি। কৃষক না বুঝে এই কাজ করার কারণে জমির মাটিতে পুষ্টিগুণ বলে কিছুই থাকছে না। গাছের জন্য গ্রহণ উপযোগী ১৭ উপাদান সবই থাকে টপ সয়েলে। এই মাটি সরানোর ফলে জমির উর্বরতা বা উৎপাদনক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। নতুন করে ক্ষত জমি আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত ৩০ বছর লাগবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ মইনুর রহমান জানান, ভালো ফলনের জন্য দরকারি উপাদান দস্তা। এখন দেশের এক-তৃতীয়াংশ জমি দস্তাশূন্য। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে অবশিষ্ট জমি এক দশকের মধ্যে পুরোপুরি দস্তাশূন্য হয়ে পড়বে। তখন ফসলের উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, মাটিতে যতই ভালো বীজ, সার আর আধুনিক কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক না কেন, তাতে কিছু যাবে-আসবে না। মাটির বুকেই যেহেতু শস্য ফলাতে হবে, সে জন্য কৃষির প্রথম কাজ হওয়া দরকার মাটিকে তার হারানো স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেওয়া।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর মোহাম্মদ জাহিদ বলেন, মাটিতে সাধারণত ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা দরকার। আমাদের দেশে উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে জৈব পদার্থ বেশি বিয়োজন হয়। তাই আমাদের সাড়ে ৩ শতাংশ থাকলেও হয়। আমরা দেখেছি, জমিতে এ পরিমাণ জৈব পদার্থ ২ শতাংশের নিচে, এমনকি কোথাও কোথাও ১ শতাংশের নিচে রয়েছে।