এ বছরের শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন জানিয়েছিল, কোমলমতি শিশুদের আর পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে না; তখন শুধু শিক্ষার্থী কিংবা তাদের অভিভাবক নন, শিক্ষানুরাগী মানুষ মাত্রই একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। অভিযোগ ছিল, কারও সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে এমনকি এর পরিণাম কী হতে পারে তাও চিন্তা না করে হঠাৎ করে কয়েক বছর আগে পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ফলে একদিকে কোমলমতি শিশুদের ওপর যেমন প্রবল শারীরিক-মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি তাদের অভিভাবকদের জন্য তৈরি হলো শারীরিক-মানসিক চাপের পাশাপাশি আর্থিক চাপ। অন্যদিকে প্রাইভেট টিউটর আর কোচিং সেন্টারগুলোর জন্য এল মুনাফা অর্জনের সুযোগ। একই সঙ্গে গাইড বই আর নোট বইওয়ালাদের জন্যও আসে রমরমা বাণিজ্যের সম্ভাবনা। স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা বন্ধের দাবি ওঠে। ফলে এ বছরের শুরুতে অষ্টম শ্রেণির পাশাপাশি পঞ্চম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষাও বন্ধের ঘোষণাটিকে প্রায় সব মহল থেকেই স্বাগত জানানো হয়।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এ স্বস্তি সম্ভবত প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের 'স্বস্তি' দিচ্ছিল না। তাই তাঁরা অতি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, পঞ্চম শ্রেণির অন্তত ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তির জন্য পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে এবং সে পরীক্ষা হবে এ মাসের শেষ সপ্তাহে।

রোববার সমকালের এক প্রতিবেদনে যেমনটা লেখা হয়েছে, সিদ্ধান্তটি তাঁরা নিয়েছেন গত ২৮ নভেম্বর এবং মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের বলেছেন ১ ডিসেম্বর। এখন কর্মকর্তারা স্কুলগুলোকে তা জানাচ্ছেন। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুসারে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করতে হবে ৮ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, যে শারীরিক-মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য শিশুদের পাবলিক পরীক্ষা বাদ দেওয়া হলো, সেই পাবলিক পরীক্ষা- ১০ শতাংশ হলেও- সেই শিশুদের ঘাড়ে চাপানোর মানে কী?

এটা ঠিক, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বহু দশক ধরে এখানে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছিল। সর্বজনীন পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমেই বৃত্তির জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হতো। সর্বজনীন পাবলিক পরীক্ষা চালুর পর তার ফলের ভিত্তিতে কাজটা সম্পাদিত হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের আবারও হয়তো ওই সীমিত পরিসরের পাবলিক পরীক্ষায় ফিরে যেতে হবে। কিন্তু বিষয়টা কি বছরের শুরুতেই ভাবা যেত না?

১৯৭৭ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বসার স্মৃতি আমার এখনও জাগরূক। দুই দিনের সেই পরীক্ষায় শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সমাজপাঠ বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হতো। কিন্তু তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হতো বছরজুড়ে। বছরের মাঝামাঝি ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ফল দিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হতো। এরপর চলত বিশেষ কোচিং- বিদ্যালয়েরই তত্ত্বাবধানে। 

এই যে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, তা কি এবার সম্ভব? প্রায় প্রস্তুতিবিহীন তড়িঘড়ি পাবলিক পরীক্ষায় বসার ফল কী হতে পারে, তাও তো বোঝা কষ্টকর কিছু নয়। এভাবে ঢাল-তলোয়ারবিহীন এক যুদ্ধের অনিবার্য ব্যর্থতা অভিভাবক না হোক, শিক্ষার্থীর মনে কতটুকু নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা কি ওই কর্মকর্তারা ভেবে দেখেছেন?

আসলে তুঘলকি কাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের জুড়ি সম্ভবত পৃথিবীতে কমই আছে। শিক্ষা বিভাগ যে এ ক্ষেত্রে সরকারের অন্য সব বিভাগের চেয়ে ঢের এগিয়ে, তা একপ্রকার হলফ করেই বলা যায়। শিক্ষার মানোন্নয়ন বা শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা বলে তারা অনেকটা আড়ালে-আবডালে শুধু পাঠ্যসূচি নয়, গোটা শিক্ষাক্রমই পাল্টে দেয়। প্রায় একই যুক্তি তুলে হঠাৎ করে বাংলা সাহিত্যের নামকরা সাহিত্যিকদের লেখা বাদ দিয়ে সেখানে অখ্যাত-অর্বাচীন লেখকদের লেখা বসিয়ে দেয়। এ নিয়ে জনপরিসরে হইচই হলে আবার ওই লেখা বদলাতেও সময় লাগে না তাদের। শিক্ষা বিভাগ বলতে যে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত দপ্তরগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তা সম্ভবত ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই।

আরও দুঃখজনক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের এমন তুঘলকি সিদ্ধান্তের পরিণাম সম্পর্কে মোটেই ভাবিত নয়! এর মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত শনিবার সমকালকে বলেন, 'এটাই বরং ভালো, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে পড়াশোনার উত্তাপের মধ্যে থাকতে থাকতেই বৃত্তি পরীক্ষাটা তাদের হয়ে যাবে। নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি বেড়িয়ে এলে তো সেই উত্তাপটা আর থাকবে না।' কতটা ইনসেনসেটিভ হলে এমন কথা বলা যায়!

এখানেই শেষ নয়; 'কেন এত দেরিতে সিদ্ধান্ত হলো'- জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন কিছু তো হয়নি। আগেও এভাবেই বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। অথচ আগেই বলা হয়েছে, তখনকার ব্যবস্থাটি মোটেই এমন ছিল না। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতায় সব দিক ভেবে সঠিক সিদ্ধান্তটা নেবেন কী, তথ্যটাই তো ঠিকমতো জানেন না তিনি! কেবল শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ন্যুনতম কমিটমেন্টবিহীন কোনো কর্মকর্তার পক্ষেই এমন দায়সারাহীন আচরণ সম্ভব। কে না জানে, এ ধরনের ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা যতদিন শিক্ষা ব্যবস্থার মাথায় বসে থাকবেন, ততদিন শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ডুমুরের ফুল হয়ে থাকবে।