ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসীদের ওপর হামলা গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে শুভ বার্তা বয়ে আনে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি এই হামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। কোনো কোনো সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে বেশিরভাগ সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বিরোধী দলের ওপর সরাসরি হামলা চালায়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ নতুন নয়। ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গক্রমে বলেন, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভা বানচাল করে দেয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার। সেদিন পুলিশের গুলিতে ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। এটি পরে 'চট্টগ্রাম গণহত্যা' নামে পরিচিতি পায়। শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বলেন, হামলার নেতৃত্ব দেওয়া তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রাপলিটন পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদাকে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আইজিপি করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে এ ভাষণ দেওয়ার দিন রাজধানীর পুরান ঢাকায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর হামলার শিকার হন বিএনপি নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সঙ্গে থাকা দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। হামলার পাশাপাশি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশের সমর্থনে লিফলেট বিতরণকালে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সমকালের জবি প্রতিবেদক ইমরান হুসাইনসহ অন্তত ৪ সাংবাদিককে মারধর করে হামলাকারীরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের মারধর প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতির বক্তব্য, ছাত্রদলের হামলায় তাঁদের ২ নেতাকর্মী আহত হয়। তাই 'তাদের মাথা ঠিক ছিল না।' ওই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ জন্য তারা ক্ষমাপ্রার্থী। ভবিষ্যতে আর কখনও এমন ঘটনা ঘটবে না বলে আশ্বস্ত করেন এ ছাত্রলীগ নেতা। 

যদি ইশরাক ও তাঁর সহযোগীরা কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ করে থাকেন, তাহলে তাঁদের দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রয়েছে। ছাত্রলীগকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এখতিয়ার সংবিধান দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলার ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণ হাতে রড নিয়ে ইশরাকের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করছে। কেউ কেউ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে। একজন হাত বাড়িয়ে ইশরাককে মারার চেষ্টাও করে। এ সময় প্রয়াত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাককে বলতে শোনা যায়- 'আমাকে মেরে ফেলবি? মার; আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।' আগের একটি মামলায় সোমবার বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী ও ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এটি নিয়ে আমাদের কোনো কথা নেই; আইন-আদালত নিজস্ব গতিতেই চলে। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক; সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। 

জবি ছাত্রলীগ সভাপতি সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষমা চেয়ে তাদের মাথা ঠিক না থাকার কথা বলেছেন। সমকালে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, হামলার সময় এ সভাপতি বলছিলেন, 'সাংবাদিকরা সব বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এসেছে।' ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকা ও দলের কাছে নিজেদের জাহির করার মানসিকতা থেকে ছাত্রলীগ নেতারা বিএনপি নেতাদের হামলার পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং বিএনপি-জামায়াতের লোক বলে অপবাদ দিয়েছে। এই ছাত্রলীগ জজ আদালতের সামনের সড়কে বিশ্বজিৎকে হত্যার সময়ও তাকে শিবির বলে আখ্যায়িত করেছিল। আগেই বলেছি, দলীয় নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের পরিণতি শুভ বার্তা বয়ে আনে না। নূর হোসেন ও ডা. মিলনের বুকের রক্ত ঝরার পর এরশাদের পতন হয়েছে। বিএনপি আমলের প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাগারে। তাই বল প্রয়োগের আগে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাত্রলীগের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পালাবদল রাজনীতির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। সাময়িক বাহবা পেতে গিয়ে হামলাকারী ভুলে যায়- তার জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষমাণ।